চালকবিহীন ট্যাক্সি পরিষেবা চালু করেছে উবার, সপ্তাহের ৭ দিনই কাজ করবে এসব গাড়ি

বিলাসবহুল রাইড-হেইলিং সংস্থা উবার এবার লন্ডনের রাস্তায় চালকবিহীন রোবোট্যাক্সি পরিষেবার পরীক্ষামূলক যাত্রা শুরু করতে চলেছে। আগামী বসন্তেই এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিযুক্ত গাড়িগুলো পরীক্ষামূলকভাবে চালু হবে, যেখানে স্টিয়ারিংয়ে কোনো মানব চালক থাকবেন না এবং গাড়ি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলবে।
এই উচ্চাভিলাষী প্রকল্পে উবার যুক্তরাজ্যের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) কোম্পানি ‘ওয়েভ’ (Wayve)-এর সঙ্গে অংশীদারিত্ব করেছে। এই উদ্যোগটি যুক্তরাজ্যের বর্তমান আইন মেনে শহরের রাস্তায় মানুষের তত্ত্বাবধানে প্রযুক্তিটি পরীক্ষা করবে। উল্লেখ্য, যুক্তরাজ্যের সরকার সম্প্রতি চালকবিহীন গাড়ি সংক্রান্ত নিয়মকানুন আরও একবার পরিবর্তনের পরই উবারের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা এল।
লক্ষ্য পুনর্বিবেচনা ও বাণিজ্যিক পরিষেবা:
উবারের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ২০২৬ সালের মধ্যে এই প্রযুক্তি ব্রিটিশ রাস্তায় নিয়ে আসা। পরবর্তীতে সেই তারিখ পরিবর্তন করে ২০২৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধ করা হয়েছিল। তবে এখন কোম্পানি বলছে, তারা ছোট আকারের স্বয়ংক্রিয় ‘বাস ও ট্যাক্সির মতো’ বাণিজ্যিক বিভিন্ন পরিষেবা আগে থেকেই চালু করার জন্য একটি কাঠামো নিয়ে আসছে। উবারের এই পরীক্ষামূলক পরিষেবাতে সরাসরি গ্রাহকদের ব্যবহারের জন্য গাড়িগুলো পাওয়া যাবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কোম্পানিটি জানিয়েছে, তারা এখনও বিস্তারিত নানা বিষয় নিয়ে কাজ করছে।
উবার এর আগে বলেছিল, যুক্তরাজ্যের আইনে অনুমতি মেলার সঙ্গে সঙ্গেই নিজেদের অ্যাপে এসব চালকবিহীন ট্যাক্সিকে নিয়মিত অপশন হিসেবে যোগ করার লক্ষ্য রয়েছে তাদের।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কর্মসংস্থান বিতর্ক:
যুক্তরাজ্যের পরিবহন মন্ত্রণালয় আশা করছে, এই শিল্প ২০৩৫ সালের মধ্যে ৩৮ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতিতে চার হাজার দুশো কোটি পাউন্ড যোগ করতে পারে। তবে, এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু উদ্বেগও রয়েছে। গত মাসে দেশটির ‘গ্যাস, মিডিয়া অ্যান্ড বিল্ডিং’ (GMB)-এর জাতীয় সম্পাদক অ্যান্ডি প্রেন্ডারগাস্ট বলেছেন, চালকবিহীন গাড়ি ও ট্যাক্সির ‘গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রভাব’, বিশেষ করে সম্ভাব্য বেকারত্ব সম্পর্কেও ভালোভাবে ভেবে দেখা উচিত।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও নিরাপত্তার প্রশ্ন:
মার্চ মাসে উবার যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অস্টিনে রোবোট্যাক্সি পরিষেবা চালু করেছে। সেখানে তারা বলেছে, দিনে ২০ ঘণ্টা ও সপ্তাহের সাত দিনই তাদের এসব চালকবিহীন গাড়ি কাজ করবে। সেখানকার গ্রাহকরা চাইলে খালি থাকা রোবোট্যাক্সি নিতে পারেন, যার জন্য কোনো বাড়তি ভাড়া দিতে হবে না। জুনে একই শহরে নিজেদের নিজস্ব চালকবিহীন ট্যাক্সি পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা করছে মার্কিন বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি নির্মাতা টেসলাও।
চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সিঙ্গাপুরের মতো অন্যান্য দেশেও চালকবিহীন গাড়ি হাজার হাজার কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিচ্ছে। তবে, সেগুলো মানুষের চালানো গাড়ির চেয়ে বেশি নিরাপদ নাকি কম, তা এখনও পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে বলে বিবিসি জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যভিত্তিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, মানুষের চালানো গাড়ির চেয়ে চালকবিহীন গাড়ি কম দুর্ঘটনা ঘটায়। তবে, যেসব দেশে রোবোট্যাক্সি চলে, সেখানে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে রয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে যাত্রী আটকে যাওয়ার মতো ঘটনাও। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের স্যান ফ্রান্সিসকোতে একটি রোবোট্যাক্সি পরিষেবা কিছু সমস্যার কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
লন্ডনের রাস্তায় উবারের রোবোট্যাক্সির আগমন নিঃসন্দেহে পরিবহন শিল্পের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তবে, এই প্রযুক্তির নিরাপত্তা, ব্যবহারিকতা এবং সামাজিক প্রভাব নিয়ে বিতর্ক ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা আগামী দিনেও চলতে থাকবে।