Chat GPT-ব্যবহারের অভিযোগ, আইনজীবীকে সাজা দিল আমেরিকার আদালত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নির্ভর চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে আদালতের নথিতে ভুয়া মামলার নজির দাখিল করার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের ইউটাহ’র এক আদালত মার্কিন আইনজীবী রিচার্ড বেডনারকে শাস্তি দিয়েছে। এই ঘটনা প্রযুক্তি এবং আইনি পেশার নৈতিকতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
ব্রিটিশ দৈনিক পত্রিকা গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রিচার্ড বেডনার আদালতে এমন কিছু কাগজ জমা দিয়েছিলেন, যেখানে চ্যাটজিপিটিকে লেখা তৈরি করে দিতে বলেছিলেন তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি সেই নথিতে এমন সব বিষয়ের উল্লেখ ছিল যেগুলোর বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। উদাহরণস্বরূপ, নথিতে এমন এক মামলার উল্লেখ ছিল, যে মামলাটি কখনোই দায়ের হয়নি। এই গুরুতর ভুলের জন্য ইউটাহ’র আপিল আদালত ওই আইনজীবীকে শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এআইয়ের তৈরি ভুয়া রেফারেন্স: কীভাবে ধরা পড়ল?
ইউটাহের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম সাইট এবিসিফোর আদালতের নথি পর্যালোচনা করে জানিয়েছে, রিচার্ড বেডনার এবং আরেকজন ইউটাহভিত্তিক আইনজীবী ডগলাস ডারবানো একটি মামলার আবেদনকারীর পক্ষের আইনজীবী ছিলেন। তারা সময়মতো মামলার আপিলের আবেদন দাখিল করেছিলেন।
আইনজীবীদের পক্ষ থেকে জমা দেওয়া আইনি প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করতে গিয়ে বিপরীত পক্ষের আইনজীবী সেখানে বেশ কয়েকটি ভুল খুঁজে পান। বিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, মামলার আবেদনের কিছু অংশ এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে মামলার রেফারেন্স ও উদ্ধৃতিও রয়েছে, যার মধ্যে অন্তত একটি মামলার কোনো অস্তিত্বই নেই। সেটি কোনো ডেটাবেজে খুঁজে পাওয়া যায়নি, কেবল চ্যাটজিপিটিতেই মিলেছে। এমনকি, কিছু রেফারেন্স ছিল এমন বিষয় নিয়ে, যেগুলোর সঙ্গে মামলার কোনো সম্পর্কই নেই। এবিসিফোর-এর প্রতিবেদনে বিশেষভাবে ‘রয়্যার বনাম নেলসন’ (Royer v. Nelson) নামের এক মামলার উল্লেখ ছিল, যার কোনো বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ভুল স্বীকার ও আদালতের রায়
ইউটাহ আপিল আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, ভুল রেফারেন্স ধরা পড়ার পর রিচার্ড বেডনার নিজের ভুল স্বীকার করেছেন এবং ক্ষমা চেয়েছেন। এপ্রিল মাসে এক শুনানির সময় বেডনার ও তার আইনজীবী স্বীকার করেছেন যে, তারা যে আবেদনের কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন, সেখানে বানানো আইনি রেফারেন্স ছিল, যা চ্যাটজিপিটি থেকে নিয়েছিলেন এবং এর দায়ও তারা স্বীকার করেছেন।
সংবাদমাধ্যমটি আরও জানিয়েছে যে, বেডনার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি নিজের ভুলের খরচ হিসেবে অন্যপক্ষের আইনজীবীর ফি নিজে দিয়ে দিতে চেয়েছেন, যাতে বিষয়টি মিটমাট করা যায়।
ইউটাহ আপিল আদালত এক বিবৃতিতে বলেছে, “আমরা এ বিষয়ে একমত যে, আইনি নথি প্রস্তুতের ক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার গবেষণার উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এটি আরও উন্নত হবে। তবে, আমরা জোর দিয়ে বলছি প্রত্যেক আইনজীবীর দায়িত্ব হলো তার আদালতে জমা দেওয়া প্রতিটি নথি সঠিক কি না তা খতিয়ে দেখা ও নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে, আবেদনকারীর আইনজীবী সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। কারণ তারা এমন এক আবেদন জমা দিয়েছেন যেখানে চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে তৈরি ভুয়া মামলার নজির রয়েছে।”
শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
ভুয়া মামলার তথ্য দেওয়ার ফল হিসেবে রিচার্ড বেডনারকে কয়েকটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। এর মধ্যে রয়েছে:
বিপক্ষের আইনজীবীর ফি পরিশোধ করতে হবে, যেটি আবেদনের কাজ ও শুনানিতে ব্যয় হয়েছে।
নিজের মক্কেলকে টাকা ফেরত দিতে হবে, বিশেষ করে আবেদন প্রস্তুত ও শুনানিতে যে সময় লেগেছে, তার জন্য নেওয়া ফি।
জরিমানা হিসেবে ইউটাহভিত্তিক আইনি সাহায্যকারী সংগঠন ‘অ্যান্ড জাস্টিস ফর অল’ (And Justice for All)-এ এক হাজার ডলার অনুদান দিতে হবে।
এই ঘটনা আইনজীবীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে এবং আইনি গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরবে।