“মহাবিশ্বের রহস্য উন্মোচনের পথে বিজ্ঞগানীরা!”-বৈজ্ঞানিক ইতিহাসে নতুন মাইলফলক স্থাপন

মহাবিশ্বকে বোঝার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী সাফল্য অর্জন করেছেন বিজ্ঞানীরা। ইউরোপের নিউক্লিয়ার রিসার্চ অর্গানাইজেশন বা ‘সার্ন’ (CERN)-এর বিজ্ঞানীরা বিশ্বে প্রথমবারের মতো ফ্রান্স থেকে সুইজারল্যান্ড পর্যন্ত অ্যান্টিম্যাটার (প্রতিপদার্থ) সফলভাবে পরিবহন করেছেন। এর জন্য তারা একটি বিশেষ শিপিং কন্টেইনার তৈরি করেছেন, যা ল্যাবরেটরির বাইরে অ্যান্টিম্যাটার পরিবহনের পথ খুলে দিয়েছে। এই অর্জন মহাকাশ ও মহাবিশ্বের রহস্য উদঘাটনে নির্ভুল অ্যান্টিম্যাটার গবেষণার এক নতুন যুগের সূচনা করেছে বলে বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন।
অ্যান্টিম্যাটার কী এবং পরিবহনের চ্যালেঞ্জ
অ্যান্টিম্যাটার হলো এমন এক পদার্থ যা সাধারণ পদার্থের বিপরীতে কাজ করে। সাধারণ বস্তুর গঠন হয় অ্যাটম দিয়ে, অ্যান্টিম্যাটারও ঠিক তেমনই, তবে এতে সবকিছুর বিপরীত চার্জ থাকে। যেমন, সাধারণ পদার্থে ইলেকট্রন নেগেটিভ ও প্রোটন পজিটিভ চার্জ ধারণ করে, কিন্তু অ্যান্টিম্যাটারে অ্যান্টি-ইলেকট্রন (পজিট্রন) পজিটিভ চার্জ ও অ্যান্টি-প্রোটন নেগেটিভ চার্জ ধারণ করে।
পৃথিবীতে হাতে গোনা কয়েকটি ল্যাবরেটরি এটি তৈরি করতে পারে। অ্যান্টিম্যাটার তৈরি করতে হলে আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে চলা বিভিন্ন কণাকে একটি স্থির লক্ষ্যবস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষের প্রয়োজন। এরপর এটিকে কন্টেইনারে আটকে রাখতে চুম্বক ব্যবহৃত হয়। এই চৌম্বকীয় ট্যাপ বা ফাঁদগুলো অনেক বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং অ্যান্টিম্যাটার যাতে সাধারণ পদার্থের সঙ্গে মিশে এমনকি সামান্য ধুলোও স্পর্শ করে নষ্ট হয়ে না যায়, সেজন্য একটি বিশেষ পরিবেশও প্রয়োজন।
সার্ন-এর যুগান্তকারী উদ্ভাবন: দুই মিটার দীর্ঘ কন্টেনমেন্ট ডিভাইস
এই জটিল সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য ইউরোপীয় গবেষণা কেন্দ্রের দলটি দুই মিটার লম্বা একটি কন্টেনমেন্ট ডিভাইস তৈরি করেছে। এই ডিভাইসটি ট্রেলারের পেছনে অ্যান্টিম্যাটার পরিবহন করতে সক্ষম হয়েছে এবং সার্ন ক্যাম্পাসের আশপাশে ৪০ কিমি/ঘণ্টার বেশি গতিতে সফলভাবে চালানো সম্ভব হয়েছে। সার্ন ক্যাম্পাসের আশপাশে অ্যান্টিম্যাটার বহন করার সময় ট্রাকটি যে রুটটি নিয়েছে, তার মানচিত্রে দেখা গেছে যে, এটি ফ্রান্স থেকে সুইজারল্যান্ড হয়ে আবার ল্যাবরেটরিতে ফিরে এসেছে।
‘প্রোটন ট্রান্সপোর্ট ফ্রম দ্য অ্যান্টিম্যাটার ফ্যাক্টরি অফ সার্ন’ (Proton Transport from the Antimatter Factory of CERN) শিরোনামে গবেষণাপত্রটির ফলাফল বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার’ (Nature)-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, “আমরা আমাদের পরীক্ষামূলক এলাকার অ্যান্টিম্যাটার ফ্যাক্টরি (AMF) থেকে আটকে থাকা বিভিন্ন প্রোটন একটি ট্রাকে স্থানান্তরিত করেছি এবং সেগুলোকে সার্ন-এর মেরিন সাইটে পরিবহন করেছি, যেখানে চার ঘণ্টা ধরে বাইরের কোনো শক্তি ছাড়া স্বতন্ত্রভাবে কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রোটন স্থানান্তর করা হয়েছে এবং এতে কোনো ক্ষতি হয়নি।”
তারা আরও উল্লেখ করেছেন, “এভাবে আমরা নিশ্চিত হয়েছি, অ্যান্টিম্যাটার ফ্যাক্টরির কাছাকাছি কম শব্দওয়ালা ল্যাবরেটরিতে এসব কণাকে স্থানান্তর করা সম্ভব এবং ট্রাকে একটি পাওয়ার জেনারেটর ব্যবহার করে ইউরোপের বিভিন্ন ল্যাবরেটরিতেও তা পৌঁছানো সম্ভব।”
ভবিষ্যতের গবেষণা ও সম্ভাব্য প্রভাব
গবেষকরা বলছেন, প্রথমবারের মতো এমন একটি প্রদর্শনী অ্যান্টিম্যাটারকে ইউরোপের বিভিন্ন ল্যাবরেটরি থেকে পাবলিক রোড নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিবহন করার পথ খুলে দিয়েছে। জার্মানির ‘হেইনরিখ হেইন ইউনিভার্সিটি ডুসেলডর্ফ’ (Heinrich Heine University Düsseldorf)-এ অত্যাধুনিক এক সুবিধা রয়েছে, যা সার্ন থেকে প্রায় আটশ কিলোমিটার দূরে। এটিই হতে চলেছে সার্ন থেকে অ্যান্টিম্যাটার গ্রহণকারী প্রথম জায়গা।
মহাকাশ ও মহাবিশ্বের মৌলিক বিষয়গুলো বোঝার জন্য অ্যান্টিম্যাটার নিয়ে গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিবহনের কৃতিত্ব “নির্ভুল অ্যান্টিম্যাটার গবেষণায় এক নতুন যুগের” সূচনা করেছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন। এই সাফল্য মহাবিশ্বের গঠন, বিগ ব্যাং-এর পরের পদার্থ-প্রতিপদার্থের অসামঞ্জস্য এবং অন্যান্য মৌলিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদের আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।