বিশেষ: শুক্রের পৃষ্ঠের নিচে কিছু একটা নড়াচড়া করছে? জেনেনিন দেখে কী বলছে গবেষকরা?

বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি শুক্র গ্রহে কিছু রহস্যময় বা অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে গ্রহটির ভেতরে সম্ভবত এখনও প্রাকৃতিক পরিবর্তন বা নড়াচড়া (ভূ-গাঠনিক কার্যকলাপ) চলছে। নতুন গবেষণা এই সম্ভাবনাকে জোরালো করেছে এবং সৌরজগতের এই নিকটবর্তী গ্রহটি সম্পর্কে নতুন তথ্য সামনে এনেছে।

নতুন গবেষণা অনুসারে, শুক্র গ্রহের পৃষ্ঠে প্রায় গোলাকার কিছু বিশেষ গঠন দেখা গিয়েছে, যেগুলিকে ‘করোনা’ (corona) বলা হয়। গবেষকদের ধারণা, এই গঠনগুলি প্রমাণ করে যে গ্রহটিতে এখনও ভূ-গাঠনিক বা টেকটোনিক কার্যকলাপ চলছে, যদিও পৃথিবীর মতো প্লেট টেকটোনিক্স সেখানে নেই।

এই গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারটি নতুন হলেও, যে তথ্য ব্যবহার করে এটি সম্ভব হয়েছে, তা ৩০ বছরেরও বেশি পুরনো। এই ডেটা যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা’র ‘ম্যাজেলান’ (Magellan) মিশন থেকে পাওয়া গিয়েছিল, যা ১৯৯০-এর দশকে শুক্রের চারপাশে প্রদক্ষিণ করেছিল, বলে ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষকরা বলছেন, শুক্রের এমন আচরণ পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটগুলোর মতোই, যা ভূত্বকের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে। পৃথিবীর প্লেটগুলি পৃষ্ঠের সান্দ্র বা আঠালো অভ্যন্তরের ওপর ভেসে চলে এবং ক্রমাগত পৃষ্ঠের পরিবর্তন ঘটায়। শুক্রের টেকটোনিক প্লেট না থাকলেও, বিজ্ঞানীরা মনে করেন এর পৃষ্ঠ এখনও ভেতরের গলিত পদার্থের কারণে পরিবর্তিত হচ্ছে। শুক্রের শত শত করোনা রয়েছে এবং ধারণা করা হয়, এগুলো তখনই তৈরি হয় যখন গ্রহের অভ্যন্তরের ম্যান্টল থেকে গরম পদার্থ ওপরে উঠে এসে পৃষ্ঠের উপরিভাগের ভূত্বককে ঠেলে তোলে।

গ্রহটির পৃষ্ঠের বিকৃতি বা পরিবর্তন হচ্ছে কিনা তা বোঝার জন্য গবেষকরা শুক্রের ‘করোনা’ নামের বিশেষ গঠন নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। এগুলো কয়েক ডজন থেকে কয়েক শত মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

গবেষকরা বলছেন, এই আবিষ্কার কেবল কাছের গ্রহ শুক্র সম্পর্কেই নয়, বরং পৃথিবীর অতীত ইতিহাস সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিতে পারে। এ গবেষণার প্রধান লেখক, বাল্টিমোর কাউন্টির ‘ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড’-এর সহকারী গবেষণা বিজ্ঞানী ও নাসা’র গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের সহকারী গবেষণা বিজ্ঞানী গায়েল ক্যাসিওলি বলেছেন, “করোনা গঠন বর্তমানে পৃথিবীতে নেই। তবে গবেষকদের ধারণা, আমাদের গ্রহ যখন তরুণ বয়সে ছিল ও যে সময় টেকটোনিক প্লেট গঠিত হয়নি, ওই সময়ের পৃথিবীতে করোনা থাকতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “মাধ্যাকর্ষণ ও ভূ-প্রকৃতি বা টপোগ্রাফি তথ্য একত্র করে করা এ গবেষণাটি শুক্রের পৃষ্ঠে বর্তমানে যেসব অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া কাজ করছে, সেগুলোর বিষয়ে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছে।”

এই গবেষণা দলটি বিস্তারিত মডেল তৈরি করে পরীক্ষা করেছে, যদি করোনা গঠনগুলো নিচ থেকে গরম বাতাসের স্তুপের মাধ্যমে তৈরি হয়, তাহলে কী হবে। তারপর সেইসব সিমুলেশনকে শুক্রের বাস্তব তথ্যের সঙ্গে তুলনা করেছেন তারা। গবেষণায় গবেষকদের সিমুলেশন এবং ম্যাজেলান থেকে পাওয়া বাস্তব তথ্য মিলে গিয়েছে। গবেষকরা বলছেন, এ গবেষণায় ৭৫টি করোনা গঠনের মধ্যে ৫২টি করোনা এমন কিছু উপাদান ধারণ করে, যেগুলো হয়তো ভাসমান ম্যান্টল পদার্থের কারণে তৈরি, যা সম্ভবত শুক্রের পৃষ্ঠের ওপর প্রভাব ফেলছে।

বিজ্ঞানীদের অনুমান, ম্যাজেলান মিশনের পুরনো তথ্য শিগগিরই নাসা’র ‘ভেরিটাস’ (VERITAS) মিশনের নতুন তথ্যের সঙ্গে যোগ হতে পারে। ভেরিটাস মিশন ২০৩১ সালের আগে উৎক্ষেপিত হবে না, তবে এটি শুক্রের মাধ্যাকর্ষণ ও অন্যান্য বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করবে। এটি কেবল শুক্রের করোনা গঠনগুলো বুঝতেই সাহায্য করবে না, বরং গ্রহটির সামগ্রিক ভূতত্ত্ব সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিতে পারে।

‘এ স্পেকট্রাম অফ টেকটোনিক প্রসেস অ্যাট করোনা অন ভেনাস রিভিল্ড বাই গ্র্যাভিটি অ্যান্ড টপোগ্রাফি’ (A spectrum of tectonic processes at coronae on Venus revealed by gravity and topography) শিরোনামে গবেষণাপত্রটি বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ (Science Advances)-এ প্রকাশিত হয়েছে।

পুরনো ডেটার নতুন বিশ্লেষণে শুক্রের অন্দরমহল সম্পর্কে নতুন তথ্য উঠে আসায় গ্রহটি নিয়ে গবেষণার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে এবং এটি পৃথিবীর ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস সম্পর্কেও নতুন করে ভাবতে উৎসাহিত করছে।