“পৃথিবীতে প্রাণ টিকিয়ে রাখতে…?”- বনের রহস্য উন্মোচনে স্যাটেলাইট পাঠাল আমেরিকা

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে যখন লড়াই তীব্র হচ্ছে, ঠিক তখনই পৃথিবীর বনের, বিশেষ করে জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলের রহস্য উন্মোচনের জন্য মহাকাশে অত্যাধুনিক একটি স্যাটেলাইট পাঠিয়েছে ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি (ESA)। মঙ্গলবার ফ্রেঞ্চ গায়ানার কৌরোতে অবস্থিত ইউরোপীয় মহাকাশ বন্দর থেকে ‘বায়োমাস’ (Biomass) নামের এই বিশেষ স্যাটেলাইটটির সফল উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এটি তৈরি করেছে এয়ারবাস ডিফেন্স এবং এরিয়ানস্পেস।
‘বায়োমাস’ স্যাটেলাইটের মূল লক্ষ্য হলো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চল সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানা এবং বোঝা, বিশেষ করে এই বনগুলি ঠিক কতটা কার্বন বায়ুমণ্ডল থেকে শোষণ করে নিজেদের মধ্যে সঞ্চয় করে রাখে, তা নির্ভুলভাবে পরিমাপ করা। পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং কার্বন চক্র নিয়ন্ত্রণে বনের ভূমিকা অপরিসীম। বন সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন নির্গত করে। এই কার্বন সঞ্চয়ের পরিমাণ জানা জলবায়ু মডেল তৈরি এবং ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য অপরিহার্য।
তবে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে কার্বন সঞ্চয়ের বিষয়টি বোঝা বিজ্ঞানীদের জন্য দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যদিও উত্তর গোলার্ধের বনাঞ্চলের মানচিত্র তৈরি এবং তাদের কার্বন পরিমাপ করা তুলনামূলকভাবে সহজ (যেমন ইএসএ-র ‘সেন্টিনেল ১’ স্যাটেলাইটের মতো অন্যান্য উপগ্রহ ব্যবহার করে), গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন অনেক বেশি ঘন এবং প্রায়শই দুর্গম হয়। এই দুর্গমতার কারণে বন থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ এবং উপগ্রহ থেকে পাওয়া ডেটা যাচাই করা কঠিন হয়ে ওঠে, যা গবেষকদের সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধা দেয়। ইএসএর আর্থ অবজারভেশন প্রোগ্রাম-এর পরিচালক সিমোনেত্তা চেলি ব্যাখ্যা করে বলেন, বিশ্বজুড়ে কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৫ শতাংশের জন্য দায়ী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বন। তাই সার্বিকভাবে কার্বন চক্রে এদের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা দূর করতে এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চলে সঞ্চিত কার্বনের পরিমাণ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় নতুন এবং নির্ভুল তথ্য সরবরাহ করার লক্ষ্যেই ‘বায়োমাস’ স্যাটেলাইটটি ডিজাইন করা হয়েছে। এই স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্য বিজ্ঞানীদের কিছু জরুরি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। সিমোনেত্তা চেলি বলেন, “বায়োমাসের মাধ্যমে পাওয়া ডেটা আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে বনের সম্ভাব্য অবক্ষয় কীভাবে জলবায়ুর সমগ্র বিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।” তিনি এই মিশনটিকে ‘খুবই সময়োপযোগী’, ‘বিজ্ঞানের বিষয়’, ‘উদ্ভাবনের বিষয়’ এবং ‘পৃথিবীর মানুষের স্বাস্থ্যেরও বিষয়’ বলে উল্লেখ করেছেন।
এই সফল উৎক্ষেপণকে মহাকাশ সংস্থা এবং প্রকল্পের অংশীদাররা স্বাগত জানিয়েছেন বলে ইউরোনিউজ জানিয়েছে। ‘বায়োমাস’ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সংগৃহীত ডেটা বিশ্বব্যাপী কার্বন সাইকেল মডেল উন্নত করতে, জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করতে এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বনাঞ্চল সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি পৃথিবীর পরিবেশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।