বিশেষ: ভবিষ্যতের ভার্চুয়াল পৃথিবী যেমন হবে, জেনেনিন কি বলছে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা?

ভবিষ্যতের কথা ভাবলে আমাদের মনে প্রায়শই উড়ে আসে উড়ন্ত গাড়ি, মানুষের মতো দেখতে রোবট বন্ধু কিংবা ভিনগ্রহে মানুষের বসতি স্থাপনের দৃশ্য। কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি আমাদের এমন এক নতুন বাস্তবতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা হয়তো আমাদের পূর্বের কল্পনাকেও ছাপিয়ে যাবে। আমরা প্রবেশ করছি এক ভার্চুয়াল দুনিয়ায়, যেখানে বাস্তবতা আর কল্পনার মধ্যকার সীমারেখা ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। মেটাভার্স, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি (VR) এবং অগমেন্টেড রিয়ালিটি (AR)-এর মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এই ভবিষ্যতের দুয়ার খুলে দিয়েছে।

আজ আমরা ইন্টারনেট ব্যবহার করি মূলত তথ্য অনুসন্ধান, অনলাইন কেনাকাটা বা যোগাযোগের মতো নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য। কিন্তু মেটাভার্সের ধারণা ইন্টারনেট ব্যবহারের এই প্রচলিত পদ্ধতিকে আমূল পরিবর্তন করে দেবে। মেটাভার্সের মাধ্যমে আমরা আক্ষরিক অর্থেই ইন্টারনেটের ভেতর ঢুকে পড়তে পারব একটি ত্রি-মাত্রিক (থ্রিডি) জগতে। সেখানে আমরা নিজেদের পছন্দসই ‘অবতার’ তৈরি করে চলাফেরা করতে পারব, ভার্চুয়াল অফিসে সহকর্মীদের সঙ্গে কাজ করতে পারব, অনলাইনে বাজার করতে পারব, এমনকি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে ভার্চুয়ালি ঘুরে বেড়াতেও পারব। বিশ্বজুড়ে বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যেমন মেটা (পূর্বের ফেসবুক), গুগল, মাইক্রোসফট এখন এই উদীয়মান ভার্চুয়াল জগতের দিকে বিশাল পরিমাণ বিনিয়োগ করছে।

তবে এই নতুন প্রযুক্তি কেবল বিনোদন বা পেশাগত কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি শিক্ষার ক্ষেত্রেও এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা হয়তো আর ইট-পাথরের শ্রেণিকক্ষে বসে থাকবে না, বরং তারা ভার্চুয়াল ক্লাসরুমে বসে বিশ্বের সেরা শিক্ষকদের থেকে সরাসরি শিক্ষা নিতে পারবে। ইতিহাসের ক্লাসে তারা হয়তো ভার্চুয়ালি প্রাচীন মিশরের পিরামিডের ভেতরে ঘুরে দেখবে, বিজ্ঞানের ক্লাসে ভার্চুয়ালভাবে মানবদেহের ভেতরকার জটিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভ্রমণ করবে এবং শিখবে।

চিকিৎসাক্ষেত্রেও এর ব্যবহার ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে। চিকিৎসকরা ভার্চুয়াল সিমুলেশনের মাধ্যমে জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ অপারেশনের অনুশীলন করতে পারছেন, যা রোগীর সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দূরবর্তী গ্রামাঞ্চলেও যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সহজে উপলব্ধ নন, সেখানে টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে রোগীকে ভার্চুয়াল চেম্বারে বসে পরীক্ষা করা এবং পরামর্শ দেওয়া সম্ভব হবে।

কাজের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে আসছে। অনেক অফিস হয়তো বাস্তব দালান-কোঠার পরিবর্তে ভার্চুয়াল অফিসে রূপান্তরিত হবে। কর্মীরা ভৌগোলিক দূরত্ব নির্বিশেষে ঘরে বসেই ভার্চুয়াল মিটিংয়ে অংশ নিতে পারবে, দলগত কাজ করতে পারবে, এমনকি ভার্চুয়াল পরিবেশে প্রেজেন্টেশনও দিতে পারবে। এর ফলে ভৌগোলিক দূরত্ব আর কাজের ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকবে না। কল্পনা করুন, একই কোম্পানিতে ঢাকা, লন্ডন ও নিউইয়র্কের কর্মীরা হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও একটি ভার্চুয়াল রুমে বসে একসঙ্গে কাজ করছে!

ভবিষ্যতের ভার্চুয়াল পৃথিবী যেমন হবে:

তবে প্রযুক্তির এই বিশাল বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কিছু সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং চ্যালেঞ্জও জড়িয়ে আছে। বিশেষজ্ঞরা ভার্চুয়াল জগতে অতিরিক্ত সময় কাটানোর ফলে আসক্তি তৈরি হওয়া, সংবেদনশীল তথ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং বাস্তব সামাজিক সম্পর্কের দুর্বল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ইতিমধ্যেই প্রকাশ করেছেন। অতিরিক্ত সময় ভার্চুয়াল জগতে নিমগ্ন থাকলে মানসিক চাপ এবং একাকীত্ব বাড়তে পারে বলেও তারা সতর্ক করেছেন। অন্যদিকে, সবার পক্ষে প্রাথমিকভাবে এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণ করা সহজ হবে না, কারণ এর জন্য প্রয়োজন উন্নত মানের ডিভাইস এবং দ্রুত গতির ইন্টারনেট সংযোগ, যা এখনো বিশ্বের সব প্রান্তে সবার নাগালের মধ্যে নেই।

তবে এই ঝুঁকি এবং চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও একটি বিষয় পরিষ্কার – প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রাকে থামানো যাবে না। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ভার্চুয়াল জগত আরও সহজলভ্য, নিরাপদ এবং বাস্তবসম্মত হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ওয়েব ৩.০-এর যুগে ইন্টারনেট আরও বেশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক হবে, যেখানে ব্যবহারকারীরাই তাদের ডেটা এবং তথ্যের উপর অধিক নিয়ন্ত্রণ রাখবে।

এমন একদিন হয়তো আসবে, যখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের একটি বড় অংশই এই ভার্চুয়াল জগতে কেটে যাবে। অফিস, শিক্ষা, বিনোদন, কেনাকাটা – সবকিছুই একটি অদৃশ্য ডিজিটাল জগতে একত্রিত হবে। বাস্তব এবং কল্পনা তখন হাত ধরে পাশাপাশি এগোবে।

ভবিষ্যতের এই ভার্চুয়াল দুনিয়া হবে এক নতুন বাস্তবতা। যেখানে হয়তো বর্তমান সময়ের অনেক সীমা থাকবে না, থাকবে কেবল অফুরন্ত সম্ভাবনা। আর সেই সম্ভাবনার হাত ধরে আমরা হয়তো এমন এক জগতে পৌঁছে যাব, যা আজকের দিনের কল্পনাকেও হার মানাবে।

(তথ্যসূত্র: মেটা ওয়েবসাইট, ভার্চুয়াল রিয়ালিটি সোসাইটি, মাইক্রোসফট টিমস, ডব্লিউইএফ, ফোর্বস)