বিশেষ: আধুনিক প্রযুক্তির ঢেউয়ে ডুবে যায় DVD -র সোনালি দিন, জেনেনিন সেই পুরোনো দিনের গল্প

একটা সময় ছিল যখন বিকেলের অবসর কিংবা ছুটির দিনে বাসার টেলিভিশনে সিডি চালিয়ে সিনেমা দেখা বা গান শোনা ছিল অনেকের কাছেই এক প্রিয় রুটিন। পাড়ার অলিগলিতে ছিল অসংখ্য ভিডিও ক্যাসেট ও সিডির দোকান। সেখানে নতুন মুক্তিপ্রাপ্ত বাংলা বা হিন্দি সিনেমা থেকে শুরু করে জনপ্রিয় বিদেশি গানের সিডি বা ডিভিডি ভাড়ায় পাওয়া যেত। দোকানের সামনে সারি সারি সিডি ডিসপ্লে করা থাকত, সিনেমাপ্রেমী ও সঙ্গীতানুরাগীরা আগ্রহভরে দেখে নিজেদের পছন্দের ডিস্কটি বেছে নিতেন। কেউ কেউ আবার প্রিয় সিনেমা বা গানের সিডি যত্ন করে সংগ্রহ করে ঘরের তাক সাজাতেন। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব দৃশ্য এখন শুধুই অতীত। বিনোদন জগতে ঘটে গেছে এক নীরব বিপ্লব।

বর্তমান সময়ে স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং সহজলভ্য ইন্টারনেট সংযোগের কারণে বিনোদনের মাধ্যমে এসেছে বিপুল পরিবর্তন। এখন গান বা সিনেমা দেখার জন্য আলাদা করে কেউ সিডি বা ডিভিডি প্লেয়ারে ডিস্ক লোড করার ধৈর্য রাখে না। ইউটিউব, নেটফ্লিক্স, হইচই, অ্যামাজন প্রাইম, স্পটিফাই কিংবা গানা-র মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলিতে এক ক্লিকেই যে কোনো গান বা সিনেমা হাতের নাগালে। এর ফলে সিডি বা ডিভিডি প্লেয়ারের প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই ফুরিয়ে গেছে। এই পরিবর্তন যেমন সময়ের দাবি, তেমনি পুরোনো দিনের সেই সরল আনন্দ ও অভ্যাসের সঙ্গে এক ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার অনুভূতিও জাগায় অনেকের মনে।

এক সময় যারা ভিডিও বা সিডির দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তাদের অনেকেই এখন বাধ্য হয়ে অন্য ব্যবসায় চলে গেছেন। কিছু পুরোনো দোকান ভেঙে মোবাইল কভার, চার্জার কিংবা অন্যান্য ইলেকট্রনিক এক্সেসরিজের দোকানে রূপান্তরিত হয়েছে। আবার কারও দোকানের অবিক্রিত সিডিগুলি এখন কেবল প্লাস্টিকের বাক্সে ধুলো জমার পাত্রে পরিণত হয়েছে। বাসাবাড়িতেও ডিভিডি প্লেয়ার এখন ধুলিমাখা একটি যন্ত্র, যার তারগুলো হয়তো খুলে স্টোররুমে তুলে রাখা হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, নতুন প্রজন্মের অনেকেই এখন আর জানেই না যে কীভাবে সিডি চালাতে হয়, বা একসময় মানুষ ভিডিও টেপ রিওয়াইন্ড করে সিনেমা দেখত।

প্রযুক্তির উন্নয়নে মানুষের চাহিদা বদলেছে, আর সেই সঙ্গে বদলেছে বিনোদন গ্রহণের ধরনও। এখন গান শোনার জন্য কেউ আর সিডি কেনে না; বরং ফোনেই স্পটিফাই, গানা বা ইউটিউবের মতো অ্যাপ ব্যবহার করে শুনে নেয় পছন্দের গান। সিনেমা দেখার জন্যও নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম, হইচই-এর মতো সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোই প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। এখানে যেমন সাশ্রয়ী মূল্যে বিশাল সংখ্যক কনটেন্ট পাওয়া যায়, তেমনি প্রয়োজন অনুযায়ী যে কোনো জায়গা থেকে, যে কোনো সময় সেগুলি উপভোগ করা যায়। এই সুবিধা ডিভিডি বা সিডির মাধ্যমে পাওয়া যেত না।

ডিভিডি ও সিডির বিলুপ্তি শুধু একটি প্রযুক্তির পতন নয়, বরং এটি একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন। সিডি চালিয়ে সবাই মিলে টিভির সামনে বসে সিনেমা দেখার সময় যে ধৈর্য এবং পারিবারিক আন্তরিকতা ছিল, তা এখন অনেকটাই কমে গেছে। এখন পরিবারের সদস্যরাও হয়তো একসঙ্গে বসে ব্যক্তিগত ডিভাইসে নিজেদের পছন্দের কনটেন্ট দেখছে। এতে ব্যক্তিগত বিনোদনের অভিজ্ঞতা হয়তো বেড়েছে, কিন্তু পারিবারিক বা সমষ্টিগত বিনোদনের সেই জায়গাটা কিছুটা হলেও সংকুচিত হয়ে গেছে।

তবে একেবারেই যে সিডি বা ডিভিডি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, তা বলাও ঠিক নয়। এখনো কিছু সংগ্রাহক বা ‘কালেক্টর’ আছেন, যারা পুরোনো দিনের নস্টালজিয়া থেকে ভালোলাগার সিনেমা বা গানের অরিজিনাল সিডি যত্ন করে সংগ্রহে রাখেন। পুরোনো দিনের কথা মনে করে যারা নস্টালজিয়ায় ভোগেন, তাদের কাছে এইসব ফিজিক্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম। তারা মনে করেন, একটানা ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলেও একসময় ডিভিডি চালিয়ে নিশ্চিন্তে মুভি দেখা যেত, যা বর্তমান প্রযুক্তি নির্ভর যুগে প্রায় অসম্ভব।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ডিভিডি ও সিডির যুগ শেষ হয়ে এলেও তার ইতিহাস, স্মৃতি এবং আবেগ আমাদের বিনোদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে থেকে যাবে বহুদিন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা হয়তো আরও আধুনিক হয়েছি, কিন্তু কিছু কিছু প্রযুক্তির হারিয়ে যাওয়া যেন আমাদের জীবনের একটি অধ্যায় সমাপ্ত হওয়ার মতোই অনুভূত হয়।