বিশেষ: হার্ট সার্জারি কেন কিডনির ক্ষতি করতে পারে? জিনিন কি বলছে গবেষকরা?

হার্ট সার্জারি বা অস্ত্রোপচারের পরে কেন কিডনির ক্ষতি হয়, তা বোঝার ক্ষেত্রে এক বড় অগ্রগতির দাবি করেছেন অস্ট্রেলিয়ার ‘ফ্লোরি ইনস্টিটিউট’-এর (Florey Institute) গবেষকরা। এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার জন্য তাঁরা হার্ট সার্জারি রোগীদের নিয়ে কর্মরত ডাক্তারদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেছেন। অস্ত্রোপচারের সময় ও এর পরেও কিডনির স্বাস্থ্য নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য তাঁরা বিশ্বে প্রথমবারের মতো একটি অত্যাধুনিক প্রাণী মডেল তৈরি করেছেন। এই মডেলটি তাঁদের ‘হার্ট-লাং’ বা হার্ট-ফুসফুস মেশিন ব্যবহার করলে কিডনির উপর কী প্রভাব পড়ে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দিয়েছে।

হার্ট-লাং মেশিন হলো এক ধরনের জীবন রক্ষাকারী ডিভাইস, যা হার্ট সার্জারির সময় হৃদযন্ত্রকে সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেও সারা দেহে রক্ত ও অক্সিজেন প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। তবে এই নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে যে, এই মেশিনটি হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী হলেও এটি কিডনির ক্ষতি করতে পারে।

এই গবেষণার জন্য মডেল হিসেবে গবেষকরা ১২টি ভেড়ার উপর অস্ত্রোপচার করেছেন। তাঁরা অস্ত্রোপচারের আগে, অস্ত্রোপচার চলাকালীন এবং অস্ত্রোপচারের কয়েক সপ্তাহ পরেও এই ভেড়াগুলির কিডনির স্বাস্থ্যের উপর নিবিড়ভাবে নজর রাখেন। গবেষকরা দেখেছেন, হার্ট-ফুসফুস মেশিন ব্যবহার শুরু করার সঙ্গে সঙ্গেই কিডনিতে রক্ত প্রবাহ এবং অক্সিজেনের মাত্রা দ্রুত গতিতে কমে যায়। অস্ত্রোপচার শেষ হওয়ার পরেও কিডনিতে অক্সিজেনের এই অভাব কমেনি। গবেষণায় দেখা গেছে, অস্ত্রোপচারের পরেও এই অবস্থা কয়েক সপ্তাহ ধরে বজায় ছিল এবং অপারেশনের চার সপ্তাহ পরেও কিডনিতে অক্সিজেনের মাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় কম ছিল।

কিডনিতে অক্সিজেনের এই দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতির ফলে দেহে নানারকম গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। যেমন – প্রদাহ (inflammation), কোষের মৃত্যু (cell death) এবং শেষ পর্যন্ত কিডনির টিস্যুতে ক্ষত (scar tissue) তৈরি হওয়া। এগুলি সবই কিডনির গুরুতর আঘাতের লক্ষণ। গবেষকরা বলছেন, তাঁদের গবেষণার এই ফলাফল থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে কেন অনেক রোগীর হার্ট সার্জারির পরে ‘অ্যাকিউট কিডনি ইনজুরি’ (Acute Kidney Injury) বা AKI-এর মতো সমস্যা হয় এবং কেন কিছু রোগী পরবর্তীকালে দীর্ঘমেয়াদি ‘ক্রনিক কিডনি ডিজিস’ (Chronic Kidney Disease) বা CKD-তে আক্রান্ত হন।

অস্ত্রোপচারের পরে প্রথম দুই দিনের মধ্যেই প্রায় অর্ধেক ভেড়ার মধ্যে AKI দেখা গেছে। এমনকি চার সপ্তাহ পরেও এদের মধ্যে এই সমস্যা রয়ে গিয়েছিল। এই গবেষণা কেবল কিডনি কীভাবে কাজ করছে, তাই দেখায়নি, বরং একটি মাইক্রোস্কোপের নীচে কিডনির টিস্যু কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাও স্পষ্ট করে দেখিয়েছে।

এই গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক যুগেশ লঙ্কাদেব (Professor Jugesh Lankadeva) বলেছেন, তাঁদের গবেষণার ফলাফল দীর্ঘদিনের একটি চিকিৎসা রহস্যের ওপর নতুন আলো ফেলেছে। তিনি বলেছেন, “আমাদের কাছে এখন স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে, হার্ট সার্জারির কারণে কিডনিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায় এবং এই কমতি সরাসরি কিডনির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।” তিনি আরও বলেন, “অস্ত্রোপচার এবং কিডনির মধ্যেকার এই যোগসূত্রটি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমেই আমরা বুঝতে পারব কীভাবে স্বল্পমেয়াদী ক্ষতি শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী কিডনি রোগে পরিণত হতে পারে।”

এই গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার জন্য ফ্লোরি ইনস্টিটিউটের গবেষকরা অস্ট্রেলিয়ার বেশ কয়েকটি বড় হাসপাতালের কার্ডিয়াক অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট (Cardiac Anesthesiologists), সার্জন (Surgeons), আইসিইউ ডাক্তার (ICU Doctors) এবং পারফিউশনিস্টদের (Perfusionists) মতো বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করেছেন। গবেষকরা বলছেন, তাঁদের এই সম্মিলিত প্রচেষ্টা একটি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত প্রাণী মডেল তৈরি করেছে। এই মডেলটি এখন হার্ট সার্জারির কারণে কিডনির ক্ষতি সঠিকভাবে শনাক্ত করতে এবং ভবিষ্যতে এর চিকিৎসার নতুন ও কার্যকর উপায় উদ্ভাবনে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই গবেষণা হার্ট সার্জারির রোগীদের কিডনি সুরক্ষায় নতুন পথ খুলে দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।