ইনস্টাগ্রাম বিক্রিতে বাধ্য হতে পারেন জাকারবার্গ, জেনেনিন কি এই অ্যান্টিট্রাস্ট মামলা?

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচার শুরু হতে চলেছে টেক জায়ান্ট মেটার বিরুদ্ধে। সোমবার ওয়াশিংটনের একটি আদালতে এই মামলার শুনানি শুরু হয়েছে, যেখানে ছবি শেয়ারিং ও মেসেজিং অ্যাপ ইনস্টাগ্রাম বিক্রিতে বাধ্য হতে পারেন মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা ও ভোক্তা অধিকার বিষয়ক নজরদারি সংস্থা ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। তাদের দাবি, প্রতিযোগিতা দমন করতেই ২০১২ সালে ইনস্টাগ্রাম এবং ২০১৪ সালে হোয়াটসঅ্যাপ অধিগ্রহণ করে মেটা। এর মাধ্যমে কোম্পানিটি কার্যত বাজারে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করেছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শুরু হওয়া এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের অধীনেও চলমান বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অ্যান্টিট্রাস্ট অভিযানের নেতৃত্ব দিচ্ছে এই ফেডারেল ট্রেড কমিশন।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এফটিসির অ্যান্টিট্রাস্ট মামলায় জয়ী হলে মার্ক জাকারবার্গকে তাদের জনপ্রিয় মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম হোয়াটসঅ্যাপ এবং ইমেজ শেয়ারিং অ্যাপ ইনস্টাগ্রামের মালিকানা ছেড়ে দিতে বাধ্য করা হতে পারে।
তবে এর আগে মেটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছিল যে তারা এই মামলায় জয়ী হবে। কোম্পানিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের অধিগ্রহণগুলো বাজার প্রতিযোগিতা এবং ভোক্তা উভয়ের জন্যই ইতিবাচক ছিল।
এদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মাসের শেষ দিকে মেটাকে অ্যান্টিট্রাস্ট বিচারের মুখোমুখি হওয়া থেকে বাঁচাতে মার্ক জাকারবার্গ ব্যক্তিগতভাবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে একটি সমঝোতার জন্য তদবির করছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মেটা আদালতে যুক্তি দিতে পারে যে অধিগ্রহণের পর থেকে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীরা আরও উন্নত অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন।
‘ভ্যান্ডারবিল্ট ল স্কুল’-এর অ্যান্টিট্রাস্ট বিভাগের অধ্যাপক রেবেকা অ্যালেনসওয়ার্থ বলেছেন, “এফটিসির মূল যুক্তি হলো, মেটার ইনস্টাগ্রাম কেনার সিদ্ধান্তটি ছিল তাদের প্রধান প্ল্যাটফর্ম ফেসবুকের ওপর থেকে প্রতিযোগিতার চাপ কমানো।”
ধারণা করা হচ্ছে, এই মামলায় মার্ক জাকারবার্গ এবং ইনস্টাগ্রামের সাবেক প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা শেরিল স্যান্ডবার্গ আদালতে সাক্ষ্য দেবেন। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই মামলার বিচার প্রক্রিয়া কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে পারে।
‘এফটিসি বনাম মেটা’ নামের এই মামলাটি সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসনের সময় দায়ের করা হলেও, তার সম্ভাব্য দ্বিতীয় মেয়াদে রাজনৈতিক বিবেচনার ফাঁদে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, জাকারবার্গ ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের কাছে মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য অনুরোধ করেছেন।
বিবিসির পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করার জন্য মেটার কাছে প্রশ্ন করা হলে তারা সরাসরি উত্তর এড়িয়ে যায়। তবে এক বিবৃতিতে মেটা বলেছে, “মেটার বিরুদ্ধে এফটিসির মামলাটি বাস্তবতাকে অস্বীকার করে আনা হয়েছে।”
মেটার যুক্তি, তাদের এই অধিগ্রহণগুলো বাজার প্রতিযোগিতা এবং ভোক্তা উভয়ের জন্যই কল্যাণকর হয়েছে। এফটিসির এই মামলাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বাজার সম্পর্কে তাদের সংকীর্ণ ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি, যেখানে বাইটড্যান্সের টিকটক, গুগলের ইউটিউব এবং মাইক্রোসফটের লিংকডইন-এর মতো শক্তিশালী প্রতিযোগীদের বাজার প্রতিযোগিতাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ইউএস ক্যাপিটল দাঙ্গার পর মেটার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিষিদ্ধ করার কারণে জাকারবার্গ এবং ট্রাম্পের মধ্যে সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়েছিল। তবে বর্তমানে তাদের সম্পর্কের বরফ কিছুটা গলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। মেটা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট উদ্বোধনী তহবিলে ১০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছে। এছাড়াও, চলতি বছরের জানুয়ারিতে কোম্পানিটি ঘোষণা করেছে যে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং আল্টিমেট ফাইটিং চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইটার বা ইউএফসি’র প্রধান ডানা হোয়াইট তাদের পরিচালনা পর্ষদে যোগ দেবেন। একই মাসে মেটা স্বাধীন ফ্যাক্ট চেকারদের বাদ দেওয়ারও ঘোষণা করেছে।
মেটার বিরুদ্ধে এই অ্যান্টিট্রাস্ট মামলার ফলাফল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভবিষ্যৎ এবং প্রযুক্তি শিল্পের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।