“ছোট হলেও শক্তিশালী”-অনুসন্ধান, উদ্ধার কাজের ভবিষ্যৎ হতে পারে এই ক্ষুদ্র রোবট

বুড়ো আঙুলের চেয়েও ছোট, পেপারক্লিপের চেয়েও হালকা! পোকামাকড়ের মতো লাফিয়ে চলবে শক্তিশালী রোবট
ক্যামব্রিজ, যুক্তরাষ্ট্র: বিজ্ঞানীরা এমন এক ক্ষুদ্র অথচ শক্তিশালী রোবট তৈরি করেছেন, যা পোকামাকড়ের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে রুক্ষ ও পিচ্ছিল পৃষ্ঠের ওপর দিয়েও অনায়াসে চলাচল করতে সক্ষম।

যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ (এমআইটি)-র একদল গবেষক এই ছোট রোবটটি তৈরি করেছেন। এটি মানুষের বুড়ো আঙুলের চেয়েও ছোট এবং একটি পেপারক্লিপের চেয়েও কম ওজনের। বিজ্ঞানভিত্তিক ওয়েবসাইট নোরিজ তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই রোবটটি সহজেই তার নিজের উচ্চতার চেয়েও বেশি উচ্চতায় লাফাতে এবং তার ওজনের দশগুণ পর্যন্ত বোঝা বহন করতে পারে।

গবেষকদের দাবি, প্রচলিত উড়ুক্কু রোবটের তুলনায় অনেক কম শক্তি ব্যবহার করে এই নতুন রোবট ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া বিভিন্ন ভবন অনুসন্ধানের মতো বাস্তব জীবনের উদ্ধার অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে।

ছোট আকারের রোবট সেইসব দুর্গম স্থানে বিশেষভাবে প্রয়োজনীয়, যেখানে মানুষ বা বড় আকারের যন্ত্রের পৌঁছানো অত্যন্ত বিপজ্জনক বা সংকীর্ণ। তবে বাজারে প্রচলিত বেশিরভাগ ক্ষুদ্র রোবট হামাগুড়ি দেয় অথবা উড়ে চলে। কিন্তু উঁচু বাধা বা পিচ্ছিল ঢালের সম্মুখীন হলে সেই রোবটগুলো প্রায়শই আটকে যায়।

অন্যদিকে, এমআইটি দলের তৈরি এই রোবটটি বাতাসে নিজেকে ওড়ানোর জন্য একটি স্প্রিংযুক্ত পা ব্যবহার করে। এছাড়াও, এতে চারটি ছোট ডানার মতো অংশ রয়েছে, যা রোবটটিকে ভারসাম্য বজায় রেখে সঠিক দিকে চলতে সাহায্য করে। গবেষণা দলটি জানিয়েছে, এই ডানাগুলো রোবটটিকে সরাসরি ওড়ায় না, বরং বাতাসে ভাসমান অবস্থায় এটিকে দিকনির্দেশ করতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে সহায়তা করে।

এমআইটির দাবি অনুযায়ী, রোবটটি প্রায় ২০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত উঁচুতে লাফাতে পারে – যা তার নিজের উচ্চতার চারগুণ বেশি। এটি প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার বেগে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে সক্ষম। ঘাস, বরফ, এমনকি ভেজা কাঁচের ওপর দিয়েও এটি সফলভাবে লাফিয়ে উঠতে এবং চলমান ড্রোনের ওপর নিরাপদে অবতরণ করতে পারে।

এই রোবটটিকে বিশেষভাবে কার্যকর করে তুলেছে এর শক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা। একই আকারের অন্যান্য প্রচলিত উড়ুক্কু রোবটের তুলনায় এটি প্রায় ৬০ শতাংশ কম শক্তি ব্যবহার করে কাজ করতে পারে। এর স্প্রিংযুক্ত পায়ের কারণেই এটি এত সহজে কাজ করতে সক্ষম।

অবতরণের সময় রোবটের স্প্রিংটি খানিকটা পেছনের দিকে গিয়ে শক্তি সঞ্চয় করে এবং সেই শক্তি পুনরায় বাতাসে লাফ দেওয়ার জন্য ব্যবহার করে। রোবটের বিভিন্ন উইং মডিউল যেকোনো শক্তির ঘাটতি পূরণ করতে এবং এটিকে সোজা রাখতে সাহায্য করে। রোবটটির ঝাপটানো ডানাগুলো নরম ও পেশীজাতীয় উপাদানের মাধ্যমে চালিত হয়, যা বিরতি ছাড়াই বারবার ওঠানামা করার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী। বিভিন্ন পরীক্ষায় ব্যবহারের সময় গবেষকদের রোবটটির কোনো সার্ভিসিং বা মেরামতের প্রয়োজন হয়নি।

প্রতিটি লাফের সময় কীভাবে চলতে হবে, তা জানতে সাহায্য করে এতে থাকা একটি স্মার্ট কন্ট্রোল সিস্টেম। এর বাইরের গতি সেন্সর ব্যবহার করে রোবটটি কোথায় অবতরণ করবে, তা নির্ধারণ করে এবং তারপর পরবর্তী লাফের জন্য প্রস্তুত হতে নিজের ডানাগুলোকে সামঞ্জস্য করে নেয়।

গবেষকরা জানিয়েছেন, এই রোবটটি অত্যন্ত টেকসই ও অভিযোজিত বলে প্রমাণিত হয়েছে। এটি সহজেই এক পৃষ্ঠ থেকে অন্য পৃষ্ঠে যেতে পারে, যেমন ঘাস থেকে ভেজা কাঁচের উপর। রোবটটির কার্যকর লাফানোর ধরনের কারণে এটি ভারী বোঝা বহন করতেও সক্ষম। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি তার দ্বিগুণ ওজন বহন করেছে এবং আরও বেশি ওজন বহনের সম্ভাবনাও রয়েছে। এর সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা ওজন নয়, বরং স্প্রিং কতটা কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, সেই বিষয়টি।