সিনেমার গল্প যেন বাস্তবে, সম্ভাব্য খুনি চিহ্নিত করতে সফটওয়্যার বানাচ্ছে যুক্তরাজ্য

প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি মানুষের জীবনযাত্রাকে কতটা বদলে দিতে পারে, তার এক স্পষ্ট চিত্রায়ণ দেখা গিয়েছিল বিখ্যাত সিনেমা ‘মাইনরিটি রিপোর্ট’-এ। যেখানে ভবিষ্যৎ ঘটনা সম্পর্কে পূর্বাভাস দিতে ব্যবহৃত হত বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি (প্রেকগ), আর সেই তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই অপরাধীকে আটক করা হত। এবার সেই কল্পকাহিনী বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। যুক্তরাজ্য এমন একটি অ্যালগরিদমভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরির কাজ করছে, যা সম্ভাব্য খুনিদের চিহ্নিত করতে সাহায্য করবে। ব্যক্তিগত ডেটা ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার আগেই সম্ভাব্য অপরাধীদের চিহ্নিত করতে সক্ষম হবে এই সফটওয়্যারটি।
প্রথমে এই প্রকল্পের নাম ছিল ‘হোমিসাইড প্রেডিকশন প্রকল্প’। পরবর্তীতে এর নামকরণ করা হয় ‘ঝুঁকি মূল্যায়ন উন্নয়নে ডেটা শেয়ারিং’। প্রকল্পটি পরিচালনা করছে যুক্তরাজ্যের মন্ত্রণালয় অব জাস্টিস। এই প্রকল্পে অ্যালগরিদম এবং ব্যক্তিগত ডেটা ব্যবহার করা হচ্ছে, যার মধ্যে প্রবেশন সার্ভিসের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রবেশন বলতে বোঝায় কোনো অপরাধীকে তার প্রাপ্য শাস্তি স্থগিত রেখে কারারুদ্ধ বা কোনো প্রতিষ্ঠানে আবদ্ধ না করে সমাজে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এই প্রকল্পটি বর্তমানে শুধুমাত্র গবেষণার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হল প্রবেশন প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে গুরুতর সহিংসতা ঘটানোর ঝুঁকি কতটা, তা বুঝতে সাহায্য করা।
আগের রক্ষণশীল প্রশাসনের অধীনে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও, গত বছর ক্ষমতায় আসা লেবার সরকারও এই প্রকল্পটিকে চালু রেখেছে। নাগরিক স্বাধীনতার জন্য কর্মরত সংগঠন স্টেটওয়াচ একটি ফ্রিডম অব ইনফরমেশন (এফওআই) অনুরোধের মাধ্যমে এই প্রকল্পের কথা জনসমক্ষে এনেছে।
স্টেটওয়াচের গবেষক সোফিয়া লায়াল এই প্রসঙ্গে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এই টুল অপরাধী হওয়ার আগেই মানুষের প্রোফাইল তৈরি করবে, যা বিচারব্যবস্থার অন্তর্নিহিত বৈষম্যকে আরও জোরদার করবে। গবেষণায় দেখা গেছে, ‘অপরাধ পূর্বাভাস’ সিস্টেমগুলো আসলে ত্রুটিপূর্ণ। তবে সরকার এমন এআই সিস্টেম চালু রাখতে চাইছে, যা কোনো কাজ করার আগেই মানুষকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করবে। লায়াল সরকারের কাছে অবিলম্বে এই ‘হত্যার পূর্বাভাস’ টুল তৈরির কাজ বন্ধ করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, লেখক ফিলিপ কে ডিকের ১৯৫৬ সালের উপন্যাস ‘মাইনরিটি রিপোর্ট’-এ সম্ভাব্য হত্যাকারীদের পূর্বাভাস দিতে অ্যালগরিদম ব্যবহারের ধারণাটি বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। এই উপন্যাসের ওপর ভিত্তি করে ২০০২ সালে একই নামে একটি জনপ্রিয় সিনেমাও তৈরি হয়, যেখানে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন টম ক্রুজ। সিনেমার কাল্পনিক জগতে ‘প্রেক্রাইম’ নামের পুলিশ অফিসাররা অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করত। তবে সেই গল্পে অ্যালগরিদমের পরিবর্তে মানসিক ক্ষমতার মাধ্যমে পূর্বাভাস দেওয়া হত।
বাস্তব জগতে অবশ্য ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের অনেক বিভাগে ‘প্রেডিকটিভ পুলিশিং’ বা পূর্বাভাসমূলক পুলিশিং ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্রমবর্ধমান সমালোচনা ও আইনি চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যের এই নতুন উদ্যোগ ‘মাইনরিটি রিপোর্ট’-এর সেই ভবিষ্যৎকে আরও একধাপ কাছে নিয়ে এল কিনা, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে।