সামুদ্রিক পাখিদের বিপদে ফেলবে স্পেসএক্স রকেট কার্গো প্রকল্প? উদ্বেগ প্রকাশ জীব বিজ্ঞানীদের

প্রত্যন্ত প্রশান্ত মহাসাগরীয় প্রবালপ্রাচীর থেকে হাইপারসনিক রকেটে পণ্য ডেলিভারি পরীক্ষার জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে ইলন মাস্কের স্পেসএক্স এবং মার্কিন বিমান বাহিনী। তবে এই উদ্যোগের ফলে জনস্টন অ্যাটলের সুরক্ষিত সামুদ্রিক পাখির ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন জীববিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রের পাখিদের নিয়ে এই উদ্বেগের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, তারা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এসব পাখিদের রক্ষার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন।

স্পেসএক্সের কার্যক্রমে সুরক্ষিত বন্যপ্রাণীর ওপর প্রভাব ফেলার ঘটনা অবশ্য এটাই প্রথম নয়। এর আগে, গত বছর টেক্সাসের বোকা চিকায় স্পেসএক্সের স্টারশিপ রকেট উৎক্ষেপণের সময় এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। সেই ঘটনায় প্লোভার শোরবার্ড পাখির বাসা ও ডিম সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়, যার ফলে আইনি জটিলতায় পড়তে হয়েছিল ইলন মাস্কের কোম্পানিকে। সেই সময় মাস্ক রসিকতা করে এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক সপ্তাহের জন্য অমলেট না খাওয়ার কথা বলেছিলেন।

মার্চ মাসে মার্কিন বিমান বাহিনী ঘোষণা করে যে স্পেসএক্সের সঙ্গে ‘রকেট কার্গো ভ্যানগার্ড’ প্রকল্পের পরীক্ষার স্থান হিসেবে তারা হাওয়াই রাজ্যের প্রায় এক হাজার ৩০০ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের একটি মার্কিন অঞ্চল ‘জনস্টন অ্যাটল’কে বেছে নিয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, এই প্রকল্পে পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেটের পরীক্ষামূলক অবতরণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মাধ্যমে দেড় ঘণ্টার মধ্যে পৃথিবীর যেকোনো স্থানে একশ টন পর্যন্ত পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে, যা দূরবর্তী স্থানে দ্রুত সামরিক সরবরাহ পাঠানোর ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।

তবে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ রিফিউজ’ ও ‘প্যাসিফিক রিমোট আইল্যান্ডস মেরিন ন্যাশনাল মনুমেন্ট’-এর অংশ হিসেবে মনোনীত ২.৬ বর্গ কিলোমিটারের এই প্রবালপ্রাচীর নিয়ে কর্মরত জীববিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রকল্পটি দ্বীপের ১৪ প্রজাতির গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পাখির জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক হতে পারে। সারা বছর ধরে প্রায় দশ লাখ সামুদ্রিক পাখি বিভিন্ন ধরনের বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে এই অ্যাটল অঞ্চলটি ব্যবহার করে। ১৯৮০-এর দশকে এসব পাখির সংখ্যা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। এই পাখি প্রজাতিগুলির মধ্যে রয়েছে লাল লেজওয়ালা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পাখি, লাল পাওয়ালা বুবি ও গ্রেট ফ্রিগেট পাখি, যাদের ডানা আট ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত।

হাওয়াইভিত্তিক জীববিজ্ঞানী স্টিভেন মিনামিশিন, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের মৎস্য ও বন্যপ্রাণী পরিষেবার অংশ জাতীয় বন্যপ্রাণী আশ্রয় ব্যবস্থার জন্য কাজ করেন, বলেছেন, “এই মুহূর্তে দ্বীপে যেকোনো ধরনের প্লেন চলাচল এসব পাখিদের ওপর প্রভাব ফেলবে।”

জনস্টনে প্রায় এক বছর কাটানো ‘ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস’-এর বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী রায়ান র‍্যাশ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, “এর ফলে সবচেয়ে বড় সমস্যাটি তৈরি করবে রকেটের তীব্র শব্দ, যা পাখিদের বাসা থেকে তাড়িয়ে দেবে ও এদের জীবনকে অনিশ্চিত করে তুলবে। এরা এতটাই উদ্বিগ্ন ও অনিশ্চিততায় পড়বে যে, এদের আর বাসায় ফিরে আসা হবে না। ফলে এসব পাখিদের প্রজন্ম হুমকির মুখে পড়বে।”

প্রতিবেদনে রয়টার্স জানিয়েছে, এই প্রকল্পের আওতায় চার বছরের মধ্যে দুটি ল্যান্ডিং প্যাড নির্মাণ ও দশটি রকেট পুনঃঅবতরণ করা হবে।

মার্কিন বিমান বাহিনীর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, “এসব প্রভাব খতিয়ে দেখতে ও সম্ভাব্য পরিবেশগত নানা প্রভাব এড়াতে ও কমিয়ে বা প্রশমিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য” তারা যুক্তরাষ্ট্রের মৎস্য ও বন্যপ্রাণী পরিষেবা (U.S. Fish and Wildlife Service) এবং জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসনের সামুদ্রিক মৎস্য পরিষেবার (National Oceanic and Atmospheric Administration’s National Marine Fisheries Service) সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছেন।

তবে, এই বিষয়ে মন্তব্যের জন্য রয়টার্সের পক্ষ থেকে স্পেসএক্স-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি।