দিদিকে গোপনে বিয়ে করেছিলেন সত্যজিৎ! পরিচালকের মা জানতেই……

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তি সত্যজিৎ রায় এবং তাঁর স্ত্রী বিজয়া রায়ের প্রেম ও বিয়ের গল্পটি ঠিক যেন সিনেমার চিত্রনাট্যের মতো। সামাজিক বাধা, পারিবারিক ভয়—সবকিছুকে ছাপিয়ে তাঁদের ভালোবাসা খুঁজে নিয়েছিল এক অন্য পথ। প্রথমে তো বিজয়া ও সত্যজিৎ ভেবেই নিয়েছিলেন, তাঁদের সম্পর্কের গভীরতা যেমন আছে তেমনই থাকবে, কিন্তু তাঁরা বিয়ে করবেন না। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। প্রথমত, সত্যজিৎ ছিলেন বিজয়ার তুতো ভাই, যা তখনকার সমাজে সহজভাবে মেনে নেওয়া কঠিন ছিল। দ্বিতীয়ত, সত্যজিৎ বিজয়ার থেকে বয়সে ছোট ছিলেন। আর সবচেয়ে বড় কারণ ছিল সত্যজিতের মা সুপ্রভা দেবীর প্রতিক্রিয়া নিয়ে তাঁদের ভয়। সত্যজিৎ এবং বিজয়া উভয়েই দুশ্চিন্তায় থাকতেন যে, এই সম্পর্কের কথা জানলে রায় পরিবারে হয়তো অশান্তি শুরু হবে। তাঁরা একে অপরকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, নিজেদের ভালোবাসার কারণে রায় পরিবারে কোনও সমস্যা হোক, তা তাঁরা বিন্দুমাত্র চাইতেন না। এই কারণেই অশান্তির ভয়ে তাঁরা প্রথমদিকে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেন।

কাকা-কাকিমার কাছে ছোটবেলা থেকে বড় হয়ে ওঠা বিজয়া চেয়েছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে। নিজে কিছু করার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। সেই সময় ভাগ‍্যক্রমে সিনেমায় অভিনয় করারও সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে সত্যজিৎ তাতে রাজি হননি এবং বিজয়াকে মানা করেছিলেন। এরই মাঝে বিজয়ার মেজদি অন্য এক পাত্র, ‘বলাই’ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে বিজয়ার বিয়ে ঠিক করে ফেলেন। কিন্তু নিজের ভালোবাসার টানে বিজয়া নিজেই সেই বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে দেন।

জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে, গান শেখানোর গুরু অনাদি দস্তিদারের কাছে বিজয়া তার মনের কথা খুলে বলেন এবং স্বীকার করেন যে তিনি সত্যজিৎ রায়কে ভালবাসেন। প্রথমে কিছুটা চমকে গেলেও, অনাদি দস্তিদার তাদের সম্পর্ককে মেনে নেন এবং তাদের পাশে দাঁড়ান।

১৯৪৭ সালে মানিকবাবু (সত্যজিৎ) যখন বম্বেতে একটি ছবি করার কথা বলছিলেন (বিজয়া শেষ পর্যন্ত সেই ছবির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন), তিনি বিজয়া রায়কে মাসিক আর্থিক সাহায্য পাঠানোর প্রস্তাব দেন। কিন্তু বিজয়া সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘আমাদের কোনোদিন বিয়ে হবে না, আর তুমি সারাজীবন আমাদের সাপোর্ট করে যাবে? তাছাড়া ভবিষ্যতের কথা তো কেউ বলতে পারে না, যদি তুমি কোনোদিন আর কারও প্রেমে পড়?’ বিজয়ার কথা শেষ না হতেই মানিকবাবু দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, ‘তুমি খুব ভাল করে জানো যে, তোমাকে ছাড়া আমি কাউকে কখনও বিয়ে করব না, তাতে যদি বিয়ে না হয় তো হবে না।’ সত্যজিতের এই অবিচল ভালোবাসা এবং দৃঢ়তা বিজয়ার মনে সাহস জোগায়।

সত্যজিতের ভালোবাসার গভীরতা উপলব্ধি করার পর প্রথমে বিজয়া সাহস করে তার মেজদিকে সত্যজিতের কথা জানান। অন্যদিকে সত্যজিৎও তাদের পারিবারিক ডাক্তার নসুবাবুকে তাদের সম্পর্কের কথা বিস্তারিত বলেন। এরপরই সত্যজিৎ ও বিজয়া স্থির করে ফেলেন যে, তাঁরা আর দেরি করবেন না। পরিবারের কাউকে না জানিয়ে, গোপনে মুম্বইতে গিয়ে রেজিস্ট্রি করে বিয়ে সারবেন। যেমন পরিকল্পনা, তেমনই কাজ। ১৯৪৯ সালে মুম্বইতে গোপনে সই বিয়ে করেন সত্যজিৎ ও বিজয়া।

ডাক্তার নসুবাবুর কাছ থেকেই সত্যজিতের মা সুপ্রভা দেবী পুরো ঘটনাটি জানতে পারেন। প্রথমে হয়তো কিছুটা দ্বিধা বা প্রশ্ন ছিল, কিন্তু শেষপর্যন্ত মানিকবাবুর মা এবং সুকুমার রায়ের স্ত্রী সুপ্রভা দেবী পুত্রবধূ হিসেবে বিজয়াকে গ্রহণ করতে রাজি হন। এরপর বিজয়া সত্যজিতের কাছ থেকে একটি চিঠি পান, যেখানে লেখা ছিল তার মা বিয়েতে রাজি হয়েছেন এবং তিনি যেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কলকাতায় চলে আসেন। সুপ্রভা দেবী শুধু বিজয়া রায়কে পুত্রবধূ হিসেবেই গ্রহণ করলেন না, নিজের অজস্র শাড়ি, ব্লাউজ, নিজের গয়নার বাক্স পুত্রবধূর জন্য রেখে দিয়েছিলেন এবং নিজ হাতে বিজয়াকে শাঁখা, নোয়া পরিয়ে দিয়ে বরণ করে নেন। এরপর লেক এভিনিউয়ের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনদের উপস্থিতিতে ধূমধাম করে সামাজিক বিবাহবাসর বসেছিল সত্যজিৎ ও বিজয়ার। ভালোবাসার জোরে সব বাধা পেরিয়ে তাঁদের সম্পর্ক পূর্ণতা পায় এক রূপকথার গল্পের মতো।