চাকরি নয়, খনি শ্রমিক হতেই কি জন্ম? প্রশ্নফাঁস ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঝাড়খণ্ডে তরুণ প্রজন্মের অগ্নিগর্ভ আন্দোলন!

প্রতিটা আন্দোলনের পর সরকার বদলায়, নেতা বদল হন, ফুলেফেঁপে ওঠে কোচিং সেন্টারের ব্যবসা— কিন্তু বদলায় না কেবল চাকরিপ্রার্থীদের ভাগ্য। বছরের পর বছর পরীক্ষার প্রস্তুতি, প্রশ্নফাঁস, দুর্নীতির অভিযোগ, পরীক্ষা বাতিল এবং আবার নতুন করে শূন্য থেকে শুরু— এই অন্তহীন গোলকধাঁধায় আটকে পড়েছে একটা আস্ত প্রজন্ম। এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও যন্ত্রণার বিস্ফোরণ ঘটেছে ঝাড়খণ্ডে। আন্দোলনরত চাকরিপ্রার্থীদের স্পষ্ট কথা, এবার আর শুধু কোনও একটি পরীক্ষা বাতিল নয়, গোটা নিয়োগ ব্যবস্থার আমূল সংস্কার করতে হবে।
কেন ফুঁসে উঠেছে ঝাড়খণ্ডের যুবসমাজ?
নিট (NEET) প্রশ্নফাঁসের পর ককরোচ জনতা পার্টি (CJP) আন্দোলনে নামে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি তোলে। দীর্ঘ লড়াই ও সোনম ওয়াংচুকের অনশনের পর সেই দাবি মেনে নেওয়া হলেও ঝাড়খণ্ডের ক্ষেত্রে প্রশ্নফাঁস ও চাকরির কেলেঙ্কারি এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ‘শিক্ষিত বেকার’-এর তকমা গায়ে মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আন্দোলনকারীদের একটাই প্রশ্ন— একজন পরীক্ষার্থী অন্তত জানতে চান যে তিনি ফেল করেছেন নিজের যোগ্যতার অভাবে, নাকি অন্য কারও প্রতারণা আর দুর্নীতির জন্য? বর্তমান ব্যবস্থায় সেই সত্যিটুকুও আর জানা সম্ভব হচ্ছে না।
আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের সুর স্পষ্ট:
‘আমরা কয়লাখনিতে কাজ করতে জন্মাইনি, পড়াশোনা আমরাও করি। কিন্তু তারপর কী হয়! ঝাড়খণ্ড মানেই কি প্রজন্ম পর প্রজন্ম ধরে খনি শ্রমিক হবে? উন্নয়নের সামান্য ছোঁয়াটুকুও আমরা পাই না কেন?’
JSSC পরীক্ষা ও স্বজনপোষণের মারাত্মক অভিযোগ
এই পুরো প্রেক্ষাপটে বারবার সামনে এসেছে ঝাড়খণ্ড স্টাফ সিলেকশন কমিশনের (JSSC) সিজিএল (CGL) পরীক্ষার প্রসঙ্গ। বছরের পর বছর এই পরীক্ষাকে ঘিরে কখনো পরীক্ষার দাবি, কখনো ফল প্রকাশ তো কখনো অনিয়মের জেরে পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন চলছে।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে টিডিপিএল (TDPL) সংস্থার সঙ্গে যুক্ত অভিযুক্ত অভয় তিওয়ারিকে ঘিরে। অভিযোগ উঠেছে, ব্লক সাপ্লাই অফিসার পদে দ্বিতীয় স্থান পাওয়া ওই ব্যক্তি পরবর্তীতে পিজিটি (PGT) পরীক্ষাতেও প্রথম স্থান অধিকার করেন! শুধু তাই নয়, একই পরিবারের একাধিক সদস্যের এই ধারাবাহিক ও অলৌকিক সাফল্য স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার ধারণাকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে।
খেটে খাওয়া মানুষের নির্মম সংগ্রাম
এই আন্দোলনের বুনোটে লুকিয়ে রয়েছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের হাজারোও সংগ্রামের গল্প। লাইব্রেরিতে দিনের পর দিন ঘাম ঝরানো পড়ুয়াদের অনেকেরই মাসিক হাতখরচ মাত্র সাড়ে তিন হাজার টাকা, অনেকের আবার সেটুকুও জোটে না। অনেকে হারিয়েছেন বাবা বা মাকে। বহু পরীক্ষার্থী সকালে মাঠে কায়িক পরিশ্রম বা চাষের কাজ করেন, দুপুরে এসে আন্দোলনে যোগ দেন, আর রাতে বাড়ি ফিরে বই নিয়ে বসেন— পাছে পরের বার চাকরিটা হয়ে যায়!
তাঁদের এই প্রতিবাদের খাদ্যতালিকাও বড্ড কঠিন— স্টিলের মগে চা, সঙ্গে কিছুটা ছাতু, চিঁড়ে বা মুড়ি। সুইগি বা জোম্যাটোর পিৎজা-বার্গার সেখানে বিলাসিতা। খেটে খাওয়া মানুষের এই লড়াই আজ শুধু চাকরি পাওয়ার নয়, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলি কী কী?
১. টিডিপিএল (TDPL) পরিচালিত সমস্ত পরীক্ষা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে।
২. অভিযুক্ত অভয় তিওয়ারির সঙ্গে যুক্ত সমস্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
৩. নির্দিষ্ট পরীক্ষার ক্যালেন্ডার, স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং সঠিক সময়ে কাট-অফ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
আন্দোলনের অন্যতম মুখ দেবেন্দ্র নাথ মাহাতো আক্ষেপের সুরে বলেন, এত কষ্ট, মেধা আর লড়াই যেন শেষ পর্যন্ত বিফলে না যায়। সরকার যেন এই তরুণ প্রজন্মের আশা পূরণ করে এবং প্রত্যেক যোগ্য প্রার্থীকে তাদের প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দেয়।