বাস্তবের ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’! ডুয়ার্সের জঙ্গল আর পাহাড়ি নদী চিরে এবার ছুটবে ট্রেন, বরাদ্দ কোটি কোটি টাকা!

মনে পড়ে শাহরুখ খান অভিনীত ‘চেন্নাই এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের জঙ্গলের ভেতর ও বিশাল জলপ্রপাতের সামনে ট্রেন ছুটে চলার নয়নাভিরাম দৃশ্যটি? গোয়া ও কর্ণাটক সীমান্তের বিখ্যাত দুধসাগর জলপ্রপাতের সেই রূপই এবার যেন ধরা পড়তে চলেছে বঙ্গের সুন্দরী ডুয়ার্সে। সবুজ অরণ্য, পাহাড়ি নদী আর মেঘে মোড়া প্রকৃতির বুক চিরে খুব শীঘ্রই ডুয়ার্সে ছুটবে ট্রেন। উত্তর-পূর্ব সীমান্ত রেলের আলিপুরদুয়ার ডিভিশনের অধীনে চালসার খুনিয়া মোড় থেকে জলঢাকা পর্যন্ত ১৭ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণে প্রায় ২৭২ কোটি টাকা অনুমোদন করেছে রেল মন্ত্রক।
সীমান্ত নিরাপত্তা ও কৌশলগত গুরুত্ব:
এই প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু পর্যটন বা যাতায়াতের সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই রেলপথ।
ডোকলাম সংযোগ: জলঢাকা নদীর উৎস সিকিমের কুপুপ এলাকায়, যা ডোকলাম এবং ভারত-চীন-ভুটান ত্রিদেশীয় সীমান্তের অত্যন্ত কাছেই। ২০১৭ সালের ডোকলাম অচলাবস্থার অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে সীমান্তে দ্রুত সেনা, রসদ ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র পৌঁছে দিতে এই ধরনের রেল যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি।
চিনের পালটা প্রস্তুতি: চিন ইতিমধ্যে তিব্বত পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারণ করেছে। অন্যদিকে ভারতও সেবক-রংপো রেল প্রকল্প দ্রুত শেষ করার পথে। এবার খুনিয়া মোড় থেকে জলঢাকা হয়ে ভবিষ্যতে সীমান্তমুখী রেল যোগাযোগ গড়ে ওঠার পরিকল্পনা ভারতের সামরিক ও কৌশলগত পরিকাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে।
পর্যটন ও অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত:
সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকায় যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি এটি ডুয়ার্সের পর্যটনে বিপ্লব আনতে চলেছে। এতদিন জলঢাকা, ঝালং, বিন্দু, টোডে বা টাংটার মতো মনোরম পাহাড়ি এলাকায় পৌঁছতে একমাত্র ভরসা ছিল সড়কপথ। দীর্ঘ পথ ও পাহাড়ি রাস্তার জেরে পর্যটকদের যে ভোগান্তি হতো, এই রেললাইন চালু হলে তার স্থায়ী সমাধান মিলবে।
প্রস্তাবিত এই রেলপথটি জলপাইগুড়ি ও কালিম্পং বন বিভাগের সংবেদনশীল এলাকা এবং চাপড়ামারি বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্যের পাশ দিয়েই এগোবে। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের দাবি, রেল চালু হলে জলঢাকা-ঝালং-বিন্দু সার্কিটে পর্যটকের সংখ্যা বহুগুণ বাড়বে। যার ফলে হোমস্টে ব্যবসা, ছোট দোকান, এবং কৃষিজ ও বনজ পণ্য পরিবহণের সুযোগ প্রসারের পাশাপাশি ডুয়ার্সে কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে। রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে এই প্রকল্পকে স্বাগত জানিয়েছেন সব মহলের নেতারাই।
সীমান্ত নিরাপত্তা, পর্যটনের প্রসার এবং উত্তরবঙ্গের সার্বিক আর্থ-সামাজিক বিকাশ—সব মিলিয়ে খুনিয়া মোড় থেকে জলঢাকা পর্যন্ত এই নতুন রেলপথ উত্তরবঙ্গের ভবিষ্যতের নতুন দিশা হতে চলেছে। এখন দেখার, সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা সেরে কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয় এই প্রতীক্ষিত রেলপ্রকল্প।