হান সংস্কৃতিই শেষ কথা! চিনের নতুন ‘এথনিক ইউনিটি’ আইন নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ

চিনের আকাশে ফের নতুন এক বিতর্কিত আইনের মেঘ। সম্প্রতি শি জিনপিং সরকার চালু করেছে ‘এথনিক ইউনিটি’ (Ethnic Unity) বা ‘জাতীয় ঐক্য’ আইন। বেইজিংয়ের দাবি, এই আইনের লক্ষ্য দেশের ৫৬টি ভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলা। কিন্তু বাস্তবচিত্র বলছে ভিন্ন কথা। সমালোচকদের দাবি, এর আড়ালে লুকিয়ে আছে হান চিনা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার এক পরিকল্পিত ছক, যা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত স্বাধীনতার কবর খুঁড়ছে।

‘সাইনিসাইজেশন’ বা চিনা সংস্কৃতির আগ্রাসন
চিনের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশই হান চিনা। নতুন এই আইনের মাধ্যমে এখন সবাইকে সেই সংস্কৃতির অনুসারী হতে বাধ্য করা হচ্ছে। উইঘুর, মঙ্গোলিয়ান এবং তিব্বতিদের মতো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষা ও বিশ্বাসকে কোণঠাসা করে মান্দারিন ও চিনা সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তিব্বতের বৌদ্ধমঠগুলোতে দলাই লামার উপাসনা নিষিদ্ধ, অন্যদিকে জিনজিয়াংয়ের উইঘুরদের জন্য তৈরি করা হয়েছে তথাকথিত ‘পুনঃশিক্ষা’ ক্যাম্প। অভিযোগ, এই নতুন আইন এখন সেই সমস্ত অমানবিক পদক্ষেপকে আইনি সুরক্ষা প্রদান করবে।

সীমানা ছাড়িয়ে নজরদারি
এই আইনের সবচেয়ে ভয়ের দিক হলো, এটি কেবল চিনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বাইরে থাকা চিনা নাগরিকদের ওপরও সমানভাবে প্রযোজ্য এই নিয়ম। সমালোচক বা ভিন্নমতাবলম্বীদের দমনে বেইজিং এখন সীমান্তকে আর বাধা মনে করছে না। অতীতে বিভিন্ন দেশে চিনের গোপন পুলিশ স্টেশনের অস্তিত্ব মিলেছে। নিউ ইয়র্ক থেকে লন্ডন—বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সক্রিয় চিনা গুপ্তচররা ভিন্নমতাবলম্বীদের হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ। এমনকি, নিজের মত প্রকাশ করায় সম্প্রতি এক চিনা ছাত্রীকে দীর্ঘ কারাবরণ করতে হয়েছে।

ইউরোপের সতর্কবার্তা ও উদ্বেগের কারণ
চিনের এই ‘একক জাতীয় পরিচয়’ তৈরির প্রকল্প নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট। বেইজিংয়ের দাবি, এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও ঐক্যের জন্য জরুরি। তবে মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এটি আসলে বৈচিত্র্য বিনাশের চূড়ান্ত ধাপ। প্রযুক্তির ব্যবহার করে নাগরিকদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর নজরদারি চালানো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ কর্মকাণ্ড আগাম অনুমান করার প্রচেষ্টায় চিন কয়েক ধাপ এগিয়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি পুনর্বিবেচনা করার দাবি উঠছে। শি জিনপিংয়ের এই ‘এক দেশ, এক পরিচয়’ নীতি আদতে বিশ্বশান্তি এবং মানবাধিকারের জন্য কতটা বিপদ ডেকে আনবে, তা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে জোর জল্পনা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *