ফ্লাইট নয়, বাসের জানলায় দুনিয়া দেখা! লন্ডন থেকে কলকাতা—সেই ৫০ দিনের রোমাঞ্চকর সফরের গল্প

আজকের দিনে আমরা কয়েক ঘণ্টার বাসযাত্রাতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। অথচ কয়েক দশক আগে মানুষ বাসে করেই পাড়ি দিতেন মহাদেশ থেকে মহাদেশ! কল্পনা করতে পারেন, লন্ডন থেকে বাসে চড়ে পৌঁছানো যাচ্ছে কলকাতায়? শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, ১৯৫৭ সালে এটিই ছিল এক বাস্তব ও রোমাঞ্চকর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা।
কীভাবে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা? ১৯৫৭ সালের ১৫ এপ্রিল ব্রিটিশ সংস্থা ‘অ্যালবার্ট ট্রাভেল’ ঐতিহাসিক এই লন্ডন-কলকাতা বাস পরিষেবা চালু করে। প্রথম যাত্রার দলটি ৫ জুন কলকাতায় এসে পৌঁছায়। পরবর্তীতে ব্রিটিশ পর্যটক অ্যান্ডি স্টুয়ার্ট এই বাসটি কিনে নেন এবং এটিকে ‘অ্যালবার্ট’ নামে একটি বিলাসবহুল ডবল-ডেকার মোবাইল হোমে রূপান্তরিত করেন। এরপর এই বাসটি লন্ডন, কলকাতা এবং সিডনিকে যুক্ত করে নতুন নতুন রুট চালু করে।
কী কী সুবিধা ছিল সেই বাসে? ৭০ বছর আগের প্রযুক্তিতেও এই বাসের সুযোগ-সুবিধা ছিল চোখ ধাঁধানোর মতো:
-
বিলাসবহুল লাউঞ্জ: বাসের উপরের তলায় থাকত অবজারভেশন লাউঞ্জ, যেখান থেকে যাত্রীরা প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করতে পারতেন।
-
অন্যান্য সুবিধা: ঘুমানোর জন্য আরামদায়ক বার্থ, বই পড়ার জন্য আলাদা জায়গা এবং নিজস্ব রান্নাঘর।
কোন কোন দেশ ঘুরে আসত বাসটি? লন্ডন থেকে রওনা হয়ে বাসটি ইউরোপ ও এশিয়ার একাধিক দেশের বুক চিরে এগিয়ে চলত। যাত্রীরা ইস্তানবুল, ভিয়েনা, তেহরান, সালজবুর্গ ও কাবুলের মতো শহরের সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ পেতেন। ভারতে প্রবেশের পর বারাণসী ও তাজমহল ঘুরে তবেই শেষ হতো এই দীর্ঘ অভিযান।
টিকিটের দাম ও পরিসমাপ্তি সেই সময়ে এই দীর্ঘ যাত্রার টিকিটের দাম ছিল ১৪৫ পাউন্ড। ১৯৬০-এর দশকের হিসেবে যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৯০০ থেকে ৩০০০ টাকার মতো। পর্যটকদের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয় হওয়া সত্ত্বেও ১৯৭০-এর দশকে এই পরিষেবা বন্ধ হয়ে যায়। মূলত আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবার দ্রুত উন্নতি এবং কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর সহজলভ্যতার কারণেই বাসের এই ঐতিহাসিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে।
আজকের এই সুপারফাস্ট যুগে ৫০ দিনের এই ধীরগতির ভ্রমণ হয়তো কেবলই নস্টালজিয়া, কিন্তু বাসের জানলা দিয়ে বিশ্ব দেখার এই অভিজ্ঞতা আজও অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো।