‘সেনাপতি’ থেকে ‘একা’!-অভিষেকের থেকে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন তৃণমূলের হেভিওয়েটরা

একসময় যা ছিল কেবলই কল্পনার অতীত, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তা-ই এখন তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের নির্মম বাস্তবতা। দলের ‘সেনাপতি’ বা ‘যুবরাজ’ হিসেবে যাঁর কথায় একসময় দল চলত, সেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ই এখন দলের অন্দরে প্রবল চাপের মুখে। ভোট-ফলাফলের পর থেকেই দলের হেভিওয়েট নেতা থেকে শুরু করে সাধারণ স্তরের কর্মীরা—সকলেই যেন কৌশলে দূরত্ব তৈরি করছেন অভিষেকের থেকে।

‘অভিষেক বিরোধী’ স্বর ও বিদ্রোহ: তৃণমূলের অন্দরে এখন কান পাতলে শোনা যাচ্ছে ‘অভিষেক বিরোধী’ গুঞ্জন। একদা অভিষেক-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত নেতা ঋজু দত্ত প্রকাশ্যে এই হারের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। তাঁর দাবি, অতিরিক্ত ‘আইপ্যাক’ (I-PAC) নির্ভরতাই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। শুধু ঋজু নন, দলের প্রবীণ নেতাদের একাংশও এখন প্রকাশ্যে অভিষেকের বিভিন্ন নীতি, বিশেষ করে ‘ডায়মন্ড মডেল’ ও ‘পুষ্পা প্রীতি’ (জাহাঙ্গির খান প্রসঙ্গ)-এর সমালোচনা করতে ছাড়ছেন না।

সম্পত্তি বিতর্ক ও দায় এড়ানোর খেলা: অভিষেকের পারিবারিক সম্পত্তির বিরুদ্ধে সরকারি নোটিশ ও বেআইনি নির্মাণের অভিযোগ ঘিরে দলের অস্বস্তি এখন চরমে। এই ইস্যুতে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মনোভাব স্পষ্টত ‘দূরত্ব বজায় রাখার’। মেয়র ফিরহাদ হাকিম হোক বা কুণাল ঘোষ—অভিষেকের সম্পত্তি বিষয়ক নোটিশ নিয়ে কেউই দায় নিতে রাজি নন। ফিরহাদ হাকিমের ‘আমি কিছু জানি না’ কিংবা কুণালের ‘আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলুন’—এই মন্তব্যগুলিই প্রমাণ করে, দলের অন্দরে অভিষেক এখন অনেকটাই অভিভাবকহীন।

যেখানে বদল দেখছে রাজনৈতিক মহল:

  • নেতৃত্বের প্রশ্ন: ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নীরবতা এবং বিভিন্ন নেতার বেসুরো মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে দলের রাশ এখন আগের মতো নেই।

  • দূরত্ব বজায় রাখার হিড়িক: ক্ষমতার দাপট কমতেই যে নেতাদের একটা বড় অংশ আগে অভিষেকের ছায়ায় থাকতে চাইতেন, তাঁরাই এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সামনে অভিষেকের বিরুদ্ধে কটাক্ষ ছুড়ে দিচ্ছেন বলে খবর।

  • ‘বস’ সংস্কৃতি বনাম আবেগ: দলের সাধারণ কর্মীরাও এখন প্রশ্ন তুলছেন সেই ‘বস’ সংস্কৃতি নিয়ে, যা অভিষেক জমানায় জাঁকিয়ে বসেছিল বলে অভিযোগ।

হিমশৈলের চূড়া: শান্তিনিকেতনে অভিষেকের বাসভবনের একাংশ ভাঙার নোটিশ থেকে শুরু করে লিস অ্যান্ড বাউন্ডস মামলা—প্রতিটি ঘটনাই অভিষেকের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও কঠিন করে তুলেছে। একটা সময় যাঁদের অভিবাদনে মুখরিত থাকত অভিষেক ব্রিগেডের মঞ্চ, এখন সেই মানুষগুলোই কি মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তৃণমূলের অন্দরে এই চোরাস্রোত আদতে এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ইঙ্গিত। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কি এই বিপর্যয় কাটিয়ে ফের ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন, নাকি দলের এই ‘দূরত্ব’ তাঁকে রাজনীতির বৃত্তে একঘরে করে ফেলবে? এখন সেটাই সবথেকে বড় রাজনৈতিক প্রশ্ন।

(তথ্যসূত্র: রাজনৈতিক ঘটনাক্রম)