“৯৬-এর গণ্ডিও পার!”-ইরান যুদ্ধ ও তেলের বাজারের আগুনে হু হু করে পড়ছে টাকার দাম

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতির গভীর প্রভাব এবার আছড়ে পড়ল ভারতীয় অর্থনীতিতে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই মার্কিন ডলারের বিপরীতে ভারতীয় মুদ্রার (INR) দরে রেকর্ড পতন অব্যাহত রয়েছে। বুধবার বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন ডলারের বিরুদ্ধে ইতিহাসের সবচেয়ে রেকর্ড তলানিতে পৌঁছে গেল ভারতীয় রুপি। এদিন এক ধাক্কায় ৩৩ পয়সা পড়ে ডলারের সাপেক্ষে রুপির দর দাঁড়ায় ৯৬.৮৬, যা আগের সেশনে ছিল ৯৬.৫৩। এর ফলে গত সপ্তাহের সর্বনিম্ন স্তর ৯৬.৬১৫০-এর রেকর্ডও ভেঙে গেল।

যুদ্ধ ও তেলের বাজারে আগুন

দিনের শুরুতে ধাক্কা খাওয়ার পর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রুপির পতন আরও গভীর হয়। একসময় ডলারের বিরুদ্ধে ভারতীয় মুদ্রার দর নেমে যায় ৯৬.৯৬-এ। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শান্তি আলোচনা কার্যত থমকে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (Crude Oil) দাম চড়া রয়েছে। আর তেলের এই লাগামছাড়া দামের কারণেই বিশ্বজুড়ে নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির (Inflation) আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা টাকার পতনকে আরও ত্বরান্বিত করছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত ভারতীয় রুপির দর প্রায় ৬ শতাংশ কমেছে। ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য এই পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগের।

কেন শক্তিশালী হচ্ছে ডলার?

বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্তরে ডলারের নিজস্ব শক্তিও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা রুপির ওপর চাপ বাড়িয়েছে:

  • ডলার ইনডেক্স: মার্কিন ডলার ইনডেক্স এক লাফে বেড়ে প্রায় ৯৯.৪-এ পৌঁছেছে। তেলের দাম বৃদ্ধি এবং মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কার কারণে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ স্তরে রাখতে পারে— এই ধারণাই ডলারকে শক্তিশালী করছে।

  • বন্ড মার্কেট: আন্তর্জাতিক বন্ড বাজারেও বড় নড়াচড়া দেখা গিয়েছে। মার্কিন ১০ বছরের বন্ড ইয়েল্ড বেড়ে ৪.৫ শতাংশের উপরে উঠে গিয়েছে। অন্যদিকে, ৩০ বছরের বন্ড ইল্ড ৫.১ শতাংশ পার করেছে। এর ফলে ভারতসহ উদীয়মান দেশগুলির মুদ্রার ওপর চাপ মারাত্মক বাড়ছে।

“বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়তে থাকায় ভারতের আমদানি খরচ এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে যাচ্ছে। তার ওপর দেশীয় বাজার থেকে বিদেশি লগ্নি কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বন্ডের সুদের হার বাড়ায় ভারতের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবর্ষে দেশের ব্যালান্স অফ পেমেন্টস (Balance of Payments) ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।” — আর্থিক বাজার বিশেষজ্ঞ

স্বস্তিতে রাখল আরবিআই-এর ‘মেগা ডিভিডেন্ড’

এই চরম উদ্বেগের আবহেও ভারতীয় অর্থনীতির জন্য কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক। রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI) সরকারকে রেকর্ড প্রায় ৩ লক্ষ কোটি টাকার ডিভিডেন্ড (Dividend) দেওয়ার ঘোষণা করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আরবিআই-এর এই বিশাল অঙ্কের ডিভিডেন্ড সরকারের ঋণ নেওয়ার চাপ কিছুটা কমাতে সাহায্য করবে এবং শেয়ার বাজারে একটি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করবে। তবে বিদেশি লগ্নি যেভাবে দেশীয় বাজার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং রুপি যেভাবে দুর্বল হচ্ছে, তা আগামী দিনে ভারতীয় অর্থনীতির জন্য বড় চিন্তার কারণ হয়েই রইল।