পদ্মাসনে বাংলা: মালদা-মুর্শিদাবাদেও কেন ডুবল ঘাসফুল? ডাবল ইঞ্জিনের ঝড়ে যেভাবে ‘তৃণমূল মুক্ত’ হল রাজ্য

দেড় দশকের তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ‘অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গ’ জয়ের লক্ষ্য পূরণ করল বিজেপি। মঙ্গলবার বিকেল ৫টা পর্যন্ত পাওয়া ভোটের ট্রেন্ড অনুযায়ী, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার ক্ষমতায় আসতে চলেছে গেরুয়া শিবির। উত্তর থেকে দক্ষিণ— সর্বত্রই বইছে গেরুয়া আবিরের সুনামি। তবে সবথেকে বড় চমক দেখা গিয়েছে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলায়। যে দুর্গ নিয়ে মমতা-অভিষেক আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, সেখানে কেন এমন রক্তক্ষরণ? কারণ খুঁজতে ময়দানে নেমেছে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

মালদা-মুর্শিদাবাদে সমীকরণ বদল
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, মালদায় ৫১.২ শতাংশ এবং মুর্শিদাবাদে ৬৬.৮ শতাংশ সংখ্যালঘু মানুষের বাস। ২০২১-এর নির্বাচনে এই দুই জেলার ৩৪টি আসনের মধ্যে ২৮টিই ছিল তৃণমূলের দখলে। কিন্তু এবারের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মুর্শিদাবাদের ২২টি আসনের মধ্যে ১৩টিই ছিনিয়ে নিয়েছে বিজেপি, কংগ্রেস, বাম ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টি। অন্যদিকে মালদাতেও মানিকচক ও বৈষ্ণবনগরের মতো তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি দখলে নিয়েছে গেরুয়া শিবির।

কেন এই ভরাডুবি? বিশ্লেষকদের চোখে তিনটি মূল কারণ:

ভোটের মেরুকরণ ও বিভাজন: রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিৎ ঘোষের মতে, এবার সংখ্যাগুরু ভোট এককাট্টা হয়েছে বিজেপির পক্ষে। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু ভোট তৃণমূলের একচেটিয়া না থেকে বাম, কংগ্রেস ও অন্যান্য দলের মধ্যে ভাগ হয়ে গিয়েছে। ফলে লড়াই সহজ হয়ে গিয়েছে বিজেপির জন্য।

কর্মসংস্থান ও পরিযায়ী শ্রমিক ইস্যু: গ্রামীণ মানুষ ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর সুবিধা পেলেও, এবার তাঁদের প্রাধান্য ছিল সন্তানদের স্থায়ী কর্মসংস্থান। মালদার হাজার হাজার পরিযায়ী শ্রমিক ভিনরাজ্যে কাজ করতে গিয়ে যে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন, তা নিয়ে ক্ষোভ ছিল তুঙ্গে। ভোট দিতে এসে শ্রমিকরা স্পষ্ট করেছেন— তাঁরা আর বাইরে যেতে চান না।

অন্নপূর্ণা যোজনা ও ডাবল ইঞ্জিন সরকার: মহিলাদের একাংশ শুধু লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে সন্তুষ্ট থাকতে চাননি। তাঁরা কেন্দ্রীয় প্রকল্প ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র হাতছানিতে সাড়া দিয়েছেন। ব্যবসায়ী মহলও মনে করেছে, কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের সরকার (ডাবল ইঞ্জিন) থাকলে বাংলার শিল্প ও পরিকাঠামোর আমূল উন্নতি সম্ভব।

মুর্শিদাবাদের ক্ষোভ ও হিংসা
মুর্শিদাবাদে তৃণমূলের হারের নেপথ্যে সামশেরগঞ্জের সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক হিংসার ছায়া দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ওই ঘটনায় হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর ছেলের নৃশংস খুনের ঘটনা হিন্দু ভোটারদের বিজেপি-মুখী করেছে। এর সঙ্গে মুসলিম ভোটের বহুমুখী বিভাজন তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিয়েছে।

স্বাধীনতার পর এই প্রথম বাংলায় পদ্ম শিবিরের সরকার প্রতিষ্ঠা হতে চলেছে। মালদা ও মুর্শিদাবাদের মানুষের প্রত্যাশা, নতুন সরকার যেন তাঁদের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দূর করে রাজ্যের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিল্প পরিকাঠামোয় নতুন দিশা দেখায়। এখন দেখার, তৃণমূলের এই ভরাডুবির পর ঘাসফুল শিবিরের থিংক-ট্যাংক আগামী দিনে কোন পথে হাঁটে।