ভবানীপুরে চুরমার মমতার দর্প! ঘরের মাঠে হারলেন ‘দিদি’, নিজের গড়ে কেন এই চরম বিপর্যয়? জানুন নেপথ্যের ইনসাইড স্টোরি

রাজনীতিতে মানুষ যে কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, ২০২৬-এর ৪ মে পশ্চিমবঙ্গ সেই ধ্রুব সত্যটাই প্রমাণ করে দিল। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে বাংলার মানুষ জানিয়ে দিল, তাঁরা আর ‘অত্যাচার’ ও ‘দুর্নীতি’ সহ্য করতে রাজি নন। যে ভবানীপুরকে কেন্দ্র করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান, সেই ভবানীপুরই আজ তাঁকে ফিরিয়ে দিল। ১৫,১০৫ ভোটের ব্যবধানে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হলেন ঘরের মেয়ে।

ভবানীপুরের মাটিতেই কেন হার?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয়ের নেপথ্যে একাধিক সমীকরণ কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ভবানীপুর এমন একটি কেন্দ্র যেখানে সব ধর্মের ও সব ভাষাভাষীর মানুষের বসবাস। এখানকার আবাসন প্রকল্প ও হাউজিং কমপ্লেক্সের সিংহভাগ ভোট এবার বিজেপির পক্ষে গিয়েছে। আরজি করের মতো জঘন্য ঘটনা থেকে শুরু করে নিয়োগ দুর্নীতি— মানুষের ক্ষোভের বারুদ জমেছিল অনেকদিন ধরেই। ২০২১ সালে ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’ স্লোগান কাজ করলেও, ২০২৬-এ সেই আবেগ ধোপে টেকেনি।

শুভেন্দুর জয় ও ভোটের পরিসংখ্যান
শখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের গণনাকেন্দ্র যখন ফল ঘোষণা করছিল, তখন সেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন না। হয়তো পরাজয়ের আঁচ আগেই পেয়েছিলেন। তথ্য অনুযায়ী, বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী পেয়েছেন ৭৩,১৯৭টি ভোট (৫৩.০২ শতাংশ)। অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝুলিতে এসেছে মাত্র ৫৮,৮১২টি ভোট (৪২.১৯ শতাংশ)। এই বিরাট ব্যবধানই বুঝিয়ে দিচ্ছে তৃণমূলের ‘পকেট ভোট’-এও এবার ধস নেমেছে।

শিল্পের শ্মশান ও চাকরির হাহাকার
২০০৬ সালে সিঙ্গুরে শিল্প আটকে যে আন্দোলনের পথে মমতার নবান্ন যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০২৬-এ যেন সেই বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো। ১৫ বছর ধরে রাজ্যে বড় কোনও শিল্প না আসা, লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত যুবক-যুবতীর চাকরির স্বপ্নভঙ্গ হওয়া এবং স্বাস্থ্য দফতরে লাগাতার দুর্নীতির অভিযোগ— সবকিছুই ব্যুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। সাধারণ মানুষের দাবি, এই ভোট ছিল তৃণমূল সরকার বনাম বাংলার শোষিত জনতার লড়াই।

ব্যর্থ আইপ্যাক, অস্তাচলে ‘ব্যর্থ’ রাজনীতি
২০২৬-এর নির্বাচনে তৃণমূলের কোনও রাজনৈতিক কৌশলই কাজে আসেনি। বিরোধীদের লাগাতার নিশানা করা কিংবা ‘অ্যাগ্রেসিভ’ প্রচার— কোনও কিছুই ভোট সুইং রুখতে পারেনি। বরং শান্তিতে ভোট হওয়ায় মানুষ নির্ভয়ে তাঁদের রায় দিয়েছেন। একসময় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে হারিয়ে মমতার হাতে ক্ষমতার যে ব্যাটন এসেছিল, আজ সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের ছায়া মেখেই সেই ক্ষমতা নবান্ন থেকে বিদায় নিল।

বাংলার রাজনীতিতে এক দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। পুলিশ, ব্যারিকেড আর বাউন্সার দিয়ে যে জনমত কেনা যায় না, ভবানীপুরের ফলাফল আজ তা স্পষ্ট করে দিল। নতুন সূর্যের অপেক্ষায় এখন পশ্চিমবঙ্গ।