তদন্তে বাধা দিতে পারেন না মুখ্যমন্ত্রী! সুপ্রিম তোপের মুখে ‘সবুজ ফাইল’ বিতর্ক, বাংলার আইনশৃঙ্খলার হাল দেখে স্তম্ভিত শীর্ষ আদালত

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক মুখে আইপ্যাক (I-PAC) মামলায় সুপ্রিম কোর্টে বড়সড় ধাক্কা খেলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত জানুয়ারি মাসে তদন্ত চলাকালীন আইপ্যাক-কর্তার বাড়িতে ও দফতরে মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উপস্থিতি নিয়ে বুধবার কড়া মন্তব্য করল শীর্ষ আদালত। বিচারপতি প্রশান্ত কুমার মিশ্র এবং বিচারপতি এন ভি আঞ্জারিয়ার বেঞ্চ সাফ জানিয়েছে, কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এভাবে চলমান তদন্তে ঢুকে পড়তে পারেন না। এতে দেশের ‘গণতন্ত্র সঙ্কটে’ পড়েছে বলেও পর্যবেক্ষণ আদালতের।

আদালতে আজ কী ঘটল? এদিন শুনানির সময় সুপ্রিম কোর্ট অত্যন্ত কঠোর ভাষায় রাজ্যের ভূমিকার সমালোচনা করে। বিচারপতিরা বলেন, “আমরা কখনও ভাবিনি যে দেশে এমন দিন আসবে যখন একজন আসীন মুখ্যমন্ত্রী এমন জায়গায় ঢুকে পড়বেন যেখানে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা কাজ করছে। কোনো মুখ্যমন্ত্রী এভাবে তদন্তের মাঝে ঢুকে গিয়ে গণতন্ত্রকে বিপন্ন করতে পারেন না।” আদালত আরও যোগ করে, “এটি কোনোভাবেই কেন্দ্র-রাজ্য বিরোধের বিষয় নয়, এটি একজন ব্যক্তির কাজ যিনি ঘটনাক্রমে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী।”

ঘটনার প্রেক্ষাপট: গত ৮ জানুয়ারি কয়লা পাচার মামলার তদন্তে কলকাতার লাউডন স্ট্রিটে আইপ্যাক প্রধান প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং সল্টলেকের অফিসে হানা দেয় ইডি। অভিযোগ ওঠে, তল্লাশি চলাকালীনই সেখানে পৌঁছে যান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ইডির দাবি, মুখ্যমন্ত্রী নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করে ল্যাপটপ, মোবাইল এবং কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘সবুজ ফাইল’ সেখান থেকে সরিয়ে ফেলেছেন। এই ঘটনাকে ‘আইনহীনতা’ বলে অভিহিত করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল কেন্দ্রীয় সংস্থা।

আদালতের পর্যবেক্ষণ ও বাস্তব পরিস্থিতি: রাজ্য সরকারের পক্ষের আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী এটিকে কেন্দ্র-রাজ্য আইনি লড়াই হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলে আদালত তা খারিজ করে দেয়। বিচারপতিরা মনে করিয়ে দেন, রাজ্যে বিচার বিভাগীয় অফিসারদের ‘হোস্টেজ’ করার মতো ঘটনাও আগে ঘটেছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবেই দেখছে আদালত। বিচারপতি মিশ্র প্রশ্ন তোলেন, “আপনারা তাত্ত্বিক নীতি নিয়ে কথা বলতে পারেন, কিন্তু আমরা বাস্তবের দিকে চোখ বন্ধ করে রাখতে পারি না।”

তৃণমূল ও বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া: সুপ্রিম কোর্টের এই কড়া মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় শুরু হয়েছে। বিজেপি এই মন্তব্যকে হাতিয়ার করে ‘গণতন্ত্র রক্ষা’র দাবি তুলেছে। অন্যদিকে, তৃণমূলের দাবি—রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবেই নির্বাচনের মুখে আইপ্যাক-এর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ইডি-কে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং মুখ্যমন্ত্রী কেবল তাঁর পরামর্শদাতা সংস্থার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

উপসংহার: প্রথম দফার ভোটের ঠিক আগের দিন সুপ্রিম কোর্টের এই পর্যবেক্ষণ রাজনৈতিকভাবে তৃণমূলকে যথেষ্ট চাপে ফেলবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আইপ্যাক-কর্তা ভিনেশ চান্ডেল বর্তমানে ইডি হেফাজতে রয়েছেন, আর তার মধ্যেই শীর্ষ আদালতের এই কড়া অবস্থান লড়াইকে আরও কঠিন করে তুলল।