একই দেশে দুই নিয়ম? বিরোধী রাজ্যে আমলাদের গণ-বদলি, অথচ বিজেপি শাসিত অসমে কেন ‘নরম’ কমিশন?

লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের দামামা বাজতেই আমলাতন্ত্রের রাশ নিজেদের হাতে নিল ভারতের নির্বাচন কমিশন। কিন্তু ৮ এপ্রিল কমিশনের জারি করা এক নজিরবিহীন নির্দেশিকাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক। অভিযোগ উঠেছে, কমিশন বেছে বেছে অ-বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতেই প্রশাসনিক রদবদল ঘটাচ্ছে, যা নির্বাচনী ময়দানে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সমতা নষ্ট করছে।
তামিলনাড়ুতে বড় ধাক্কা, ক্ষুব্ধ স্ট্যালিন: তামিলনাড়ুর প্রশাসনিক স্তরে কার্যত ধস নামিয়েছে কমিশন। সরিয়ে দেওয়া হয়েছে মুখ্য সচিব এন. মুরুগানন্দম এবং ডিজিপি (ভিজিল্যান্স) এস. ডেভিডসন দেব আশীর্বাদকে। এই পদক্ষেপে মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট্যালিন অত্যন্ত ক্ষুব্ধ। তিনি অভিযোগ করেছেন:
-
এই রদবদল সরাসরি ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অঙ্গুলিহেলনে করা হয়েছে।
-
বিজেপি ও এআইএডিএমকে-র তৈরি করা ‘নীল নকশা’ সফল করতেই আমলাদের টার্গেট করা হচ্ছে।
-
২৩ এপ্রিল ভোটের ঠিক আগে এই পরিবর্তন প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করবে।
বাংলায় নজিরবিহীন গণ-বদলি: পশ্চিমবঙ্গেও কমিশন এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ নিয়েছে। একসঙ্গে ৪৮৩ জন প্রশাসনিক ও পুলিশ আধিকারিককে বদলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, এই ব্যাপক রদবদল আসলে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি-কে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কৌশল। যদিও কলকাতা হাইকোর্ট এই নির্দেশের বৈধতা দিয়েছে, তবুও তৃণমূল নেতৃত্বের প্রশ্ন—কেন সব নির্দেশ বিরোধী রাজ্যগুলোর জন্যই সংরক্ষিত?
অসমের ছবিতে বৈপরীত্য কেন? বিরোধী দলগুলির তর্কের মূল অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে বিজেপি শাসিত অসম। তথ্য বলছে:
-
বাংলা ও তামিলনাড়ুতে যেখানে শত শত আধিকারিক বদলি হচ্ছেন, সেখানে অসমে মাত্র ৫ জন এসপি এবং কয়েকজন স্থানীয় আধিকারিককে সরানো হয়েছে।
-
বিরোধীদের প্রশ্ন, বিজেপি শাসিত রাজ্যে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে কি কমিশনের কোনও সংশয় নেই?
কমিশনের সাফাই ও বিরোধীদের উদ্বেগ: নির্বাচন কমিশন বরাবরই দাবি করে আসছে যে, তারা কোনো বিশেষ দলের হয়ে নয়, বরং অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থেই এই কড়া পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু সংবেদনশীল এলাকা চিহ্নিতকরণ বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ায় যেভাবে বিরোধী রাজ্যের পুলিশি কাঠামো বদলে দেওয়া হচ্ছে, তাকে অনেকেই ‘প্রশাসনিক একনায়কতন্ত্র’ হিসেবে দেখছেন।
একনজরে বিতর্কিত রদবদল: | রাজ্য | শাসক দল | রদবদলের সংখ্যা (প্রায়) | বিরোধীদের মূল অভিযোগ | | :— | :— | :— | :— | | পশ্চিমবঙ্গ | তৃণমূল কংগ্রেস | ৪৮৩ জন আধিকারিক | বিজেপি-কে সুবিধা দেওয়ার কৌশল | | তামিলনাড়ু | ডিএমকে (DMK) | শীর্ষ আমলা ও ডিজিপি | এক্তিয়ার বহির্ভূত হস্তক্ষেপ | | অসম | বিজেপি (BJP) | নগণ্য (মাত্র কয়েকজন) | কমিশনের ‘নরম’ মনোভাব |
ভোট যত এগিয়ে আসছে, নিরপেক্ষতার এই লড়াই ততই রাজপথ থেকে আদালতের আঙিনায় ছড়িয়ে পড়ছে। কমিশনের স্বতন্ত্র ইমেজ কি বজায় থাকবে? নাকি আমলাতন্ত্রের এই দড়িটানাটানি ভোটের ফলে বড় প্রভাব ফেলবে—সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল।