‘যা গেছে তা গেছে…’ সুদীপ্ত সেনের জেলমুক্তিতে কি ফিরবে সাধারণ মানুষের চোখের জল?

২০১৩ সালের এপ্রিলের সেই তপ্ত বিকেল। জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখে শোনা গিয়েছিল সেই অমোঘ বাক্য— “যা গেছে, তা গেছে…”! সেই দিনটি ছিল বাংলার লক্ষ লক্ষ আমানতকারীর জীবনের ‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে’। আজ দীর্ঘ এক যুগ পর, সেই কুখ্যাত সারদা চিট ফান্ড কাণ্ডের মূল পান্ডা সুদীপ্ত সেন যখন জেলমুক্তির দোরগোড়ায়, তখন আবারও ফিরে আসছে সেই যন্ত্রণার স্মৃতি। আড়াই হাজার কোটি টাকার তছরূপের দায়ে ১২ বছর জেল খাটার পর আজই হয়তো খোলা আকাশ দেখতে চলেছেন তিনি।

বাস্তবের ‘ফির হেরা ফেরি’: কীভাবে বোনা হয়েছিল জাল?

আপনারা কি ‘ফির হেরা ফেরি’ সিনেমার সেই ‘২৫ দিনে পয়সা ডাবল’ স্কিমের কথা মনে আছে? সুদীপ্ত সেনের সারদা গোষ্ঠী ঠিক সেই স্বপ্নই ফেরি করত গ্রাম বাংলার আনাচে-কানাচে। ১ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করলে ১৪ বছরে ১০ লক্ষ টাকা রিটার্ন— এই অবিশ্বাস্য লোভে পা দিয়েছিলেন সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষ। জমি বা ফ্ল্যাটের প্রলোভন দেখিয়ে বাজার থেকে তোলা হয়েছিল কোটি কোটি টাকা।

রাজনীতি ও গ্ল্যামারের ককটেল

সারদা কাণ্ড কেবল একটি আর্থিক প্রতারণা ছিল না, এটি ছিল ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির এক বিশাল গোলকধাঁধা। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন শাসকদলের বহু শীর্ষ নেতা এই গোষ্ঠীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রমোট করেছিলেন।

  • ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর: অভিনেত্রী তথা তৃণমূল নেত্রী শতাব্দী রায় ছিলেন এই গোষ্ঠীর প্রচারের মুখ।

  • মিডিয়া সাম্রাজ্য: তৃণমূল নেতা কুণাল ঘোষ সামলেছিলেন সারদার প্রায় ৯৮৮ কোটি টাকার বিশাল মিডিয়া নেটওয়ার্ক।

  • প্রভাবশালী যোগ: নাম জড়িয়েছিল তৎকালীন দাপুটে মন্ত্রী মদন মিত্র এবং সাংসদ সৃঞ্জয় বোসেরও। এমনকি অসমের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা এবং কংগ্রেস নেতা মাতঙ্গ সিংয়ের নামও এই তদন্তের গতিপথে উঠে এসেছিল।

ছোট ব্যবসায়ী থেকে ধনকুবের: উল্কাগতিতে উত্থান

২০০০ সালের দিকে সুদীপ্ত সেন ছিলেন অতি সাধারণ এক ব্যবসায়ী। কিন্তু ২০০৬ সালে ‘সারদা গোষ্ঠী’ গড়ার পর থেকেই তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। চতুরতার সঙ্গে তৈরি করেন এজেন্ট নেটওয়ার্ক। এজেন্টদের দেওয়া হতো ৪০ শতাংশ পর্যন্ত মোটা কমিশন এবং দামি সব ‘কমেন্ডেশন গিফট’। ২০১১ সালে সেবি (SEBI) সতর্ক করলেও, বেনামি অ্যাকাউন্টে টাকা সরিয়ে এবং রিয়েল এস্টেট ও ট্যুরিজমের আড়ালে জালিয়াতি চলতেই থাকে।

পতন ও কাশ্মীর কানেকশন

২০১৩ সালে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে সারদার সাম্রাজ্য। সেই বছরের এপ্রিলে কাশ্মীরের সোনমার্গ থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে সুদীপ্ত সেন ও তাঁর ছায়াসঙ্গিনী দেবযানী মুখোপাধ্যায়কে। রাজ্যজুড়ে শুরু হয় এজেন্টদের আত্মহত্যা আর সর্বস্ব হারানো মানুষের হাহাকার।

শেষ কথা: বিচার কি পেলেন সাধারণ মানুষ?

সুদীপ্ত সেন আজ জেল থেকে বেরোতে পারেন, কিন্তু সেই কয়েক লক্ষ মানুষের কী হবে যাদের জীবনের শেষ সম্বলটুকু সারদার গ্রাসে চলে গিয়েছে? তদন্ত হয়েছে, সিবিআই জেরা করেছে, নেতা-মন্ত্রীরা জেলে গিয়েছেন আবার ফিরেও এসেছেন। কিন্তু আড়াই হাজার কোটি টাকার সেই তছরূপ হওয়া অর্থের সিংহভাগই আজও অধরা। আমানতকারীদের জন্য আজও সেই একটাই নির্মম সত্য ফিরে ফিরে আসে— ‘যা গেছে, তা গেছে’