“পুরনো ড্রেন আর বহুতলের ভিড়!”-রাস্তায় জল জমার আসল কারণ জানালেন ইঞ্জিনিয়ার

সামান্য দু-এক ঘণ্টার বৃষ্টি, আর তাতেই জলমগ্ন মহানগরী থেকে শহরতলি। অফিস ফেরত মানুষের নাজেহাল দশা আর থমকে যাওয়া যানজট—এটাই এখন কলকাতার চেনা ছবি। কিন্তু কেন এমন হয়? এর পেছনে কি শুধু সরকারি গাফিলতি, নাকি আমাদের জীবনযাত্রার ধরণও দায়ী? অনুসন্ধানে উঠে এল চাঞ্চল্যকর কিছু কারণ।

ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রকৃতির সীমাবদ্ধতা কলকাতা মূলত গঙ্গা বদ্বীপের নিচু সমতলে অবস্থিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরের এই বাটির মতো গঠনের কারণে জল সহজে গড়িয়ে যেতে পারে না। গঙ্গার কাছাকাছি হওয়ায় মাটির জলধারণ ক্ষমতা বেশি, ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই মাটি আর জল শুষতে পারে না।

পুরনো নিকাশি ও জনসংখ্যার চাপ কেএমডিএ-র প্রাক্তন ইঞ্জিনিয়ার প্রসূন বিশ্বাসের মতে, শহরের নিকাশি পরিকাঠামো ব্রিটিশ আমলের। তখন যে জনসংখ্যা ছিল, আজ তার কয়েক গুণ বেড়েছে। যেখানে একটি বাড়িতে একটি পরিবার থাকত, আজ সেখানে বহুতলে ৪০টি পরিবার। কিন্তু ড্রেনের পাইপ সেই একই রয়ে গিয়েছে। ফলে অতিরিক্ত জলের চাপ নিতে পারছে না সিস্টেম।

জলাভূমি ধ্বংস ও ‘কংক্রিট’ অভিশাপ এক সময় কলকাতার চারপাশে প্রাকৃতিক ‘স্পঞ্জ’ হিসেবে কাজ করত বিস্তীর্ণ জলাভূমি। এখন সেই সব বুজিয়ে তৈরি হয়েছে আবাসন ও বাজার। ফলে বৃষ্টির জল জমার কোনো জায়গা নেই। শহরজুড়ে কংক্রিট আর অ্যাসফাল্টের আস্তরণ মাটির স্বাভাবিক জল শোষণ ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে।

প্লাস্টিক ও নাগরিক অসচেতনতা নিকাশি লাইনের মুখ বন্ধ হওয়ার প্রধান কারণ হলো যত্রতত্র ফেলা প্লাস্টিক ব্যাগ, বোতল ও আবর্জনা। নিয়মিত ডেসিল্টিং বা ড্রেন পরিষ্কারের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশেষজ্ঞের মত: “আমরা শহরের ওপর লোড বাড়িয়েছি কিন্তু পরিকাঠামো আধুনিক করিনি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও জলাভূমি রক্ষা না করলে কলকাতা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপদে পড়বে।” — অপূর্ব মজুমদার, কেএমডিএ ঠিকাদার।

সমাধান কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু নিকাশি পাম্প বাড়িয়ে লাভ নেই। প্রয়োজন:

  • প্লাস্টিকের ব্যবহারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা।

  • অপরিকল্পিত বহুতল নির্মাণ বন্ধ করা।

  • কৃত্রিম জলাধার তৈরি ও বৃষ্টির জল সংরক্ষণের ব্যবস্থা।

তিলোত্তমাকে বাঁচাতে হলে এবার নাগরিক ও প্রশাসন—উভয়পক্ষকেই দায়িত্ব নিতে হবে। নয়তো প্রতি বর্ষায় জলবন্দি জীবনই হবে কলকাতার নিয়তি।