শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড নিয়ে ব্রিটিশ ল’ ফার্মের চিঠি! ‘আদালত অবমাননা’ ও ‘আইনি ভিত্তি’ নিয়ে বিতর্ক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ড বাতিলের দাবি জানিয়ে ব্রিটিশ ল’ ফার্ম ‘কিংসলি নাপলি’-র পাঠানো একটি চিঠিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের আইনি ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর এই পদক্ষেপকে ‘আদালত অবমাননা’ হিসেবে অভিহিত করলেও আইনজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।


১. ল’ ফার্মের চিঠিতে প্রধান দাবিগুলো কী?

ব্রিটিশ আইনি প্রতিষ্ঠানটি শেখ হাসিনার পক্ষে একটি আইনি নোটিশ পাঠিয়েছে, যেখানে নিম্নলিখিত অভিযোগগুলো তোলা হয়েছে:

  • আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন: শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতে বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।

  • রাজনৈতিক পরিবেশ: ২০২৫ সালে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়া এবং আইনজীবীদের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, বিচারটি ‘শত্রুভাবাপন্ন’ পরিবেশে হয়েছে।

  • বিচারকদের নিরপেক্ষতা: ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতার অভাব এবং বেঞ্চ গঠনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তোলা হয়েছে।

  • সুযোগের অভাব: শেখ হাসিনাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের বা প্রমাণ পেশের কোনো সুযোগ দেওয়া হয়নি, যা আন্তর্জাতিক চুক্তির (ICCPR) ১৪ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন।

  • দাবি: রায় বাতিল করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পুনর্বিচার করতে হবে। তারা ১৪ দিনের মধ্যে জবাব চেয়েছে।


২. চিফ প্রসিকিউটরের কড়া জবাব

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম এই চিঠিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন:

“ওই প্রতিষ্ঠানটি যা করেছে তা আদালত অবমাননা। একজন পলাতক আসামি আদালতে হাজির না হয়ে ব্যক্তিগতভাবে কোনো ল’ ফার্ম বা আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন না। আমাদের আইনে এর কোনো সুযোগ নেই।”

তিনি আরও যোগ করেন যে, এই চিঠির মূল উদ্দেশ্য হতে পারে ট্রাইব্যুনালের কর্মকাণ্ডকে বিতর্কিত করা বা আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা বজায় রাখা। আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।


৩. আইনজীবীদের বিশ্লেষণ: ‘জিরো ইমপ্যাক্ট’ বনাম ‘আইনি আলোচনা’

ল’ ফার্মের এই চিঠির কার্যকারিতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবীদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে:

আইনজীবী প্রধান বক্তব্য
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া “এর ইমপ্যাক্ট জিরো। এটি একটি ‘পাবলিসিটি স্ট্যান্ট’। ব্রিটিশ ল’ ফার্মের এভাবে বাইরে থেকে আদালতকে ডিকটেট করার কোনো এখতিয়ার নেই। পলাতক আসামির কোনো আইনি সুরক্ষা নেই; আপিল করতে হলে তাঁকে সশরীরে হাজির হতে হবে।”
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ “আমি এতে আদালত অবমাননার কিছু দেখছি না। রায় হয়ে যাওয়ার পর তা নিয়ে লিগ্যাল আর্গুমেন্ট করা যায়। শেখ হাসিনা আইনি পরামর্শ নিতেই পারেন, যদিও মামলা লড়তে হলে ওকালতনামায় সই করতে হয়। তবে চিঠির কোনো আইনগত গুরুত্ব নেই।”

৪. রহস্য ও অস্পষ্টতা

  • নিয়োগকারী কে? সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত চিঠির কপিটি সরবরাহ করলেও তিনি জানেন না শেখ হাসিনা নিজে না কি অন্য কেউ এই ল’ ফার্মকে নিয়োগ করেছেন।

  • উত্তরের অভাব: ল’ ফার্ম কিংসলি নাপলি-র সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করেনি।

  • আইনি অবস্থান: বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, দণ্ডিত ব্যক্তি পলাতক থাকা অবস্থায় তাঁর পক্ষে কোনো আইনি পদক্ষেপ বা আপিল গ্রাহ্য হয় না।


প্রেক্ষাপট: ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। বর্তমানে মামলাটি আপিল পর্যায়ে থাকলেও আসামি পলাতক থাকায় এই চিঠির আইনি ভবিষ্যৎ অত্যন্ত ক্ষীণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।