৫ পয়সার জন্য ৪০ বছরের বনবাস! সন্তানদের চোখেও ‘চোর’ হয়েছিলেন এই বাস কন্ডাক্টর

একটি ৫ পয়সার কয়েন, যা আজ ভারত থেকে বিলুপ্ত। কিন্তু এই সামান্য ৫ পয়সার জন্যই দিল্লির এক বাস কন্ডাক্টর রণবীর সিং যাদবকে লড়তে হলো দীর্ঘ ৪০ বছর। যে বয়সে মানুষের তীর্থে যাওয়ার কথা, সেই বয়সে তিনি ঘুরেছেন আদালতের অলিন্দে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর এই লড়াইয়ের কাহিনী নতুন করে ভাইরাল হতেই আবেগে ভাসছে নেটদুনিয়া। প্রশ্ন উঠছে আমাদের বিচার ব্যবস্থার গতি আর প্রশাসনিক জেদ নিয়ে।
ঘটনার সূত্রপাত ১৯৭৩ সালে: দিল্লি ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশনের (DTC) বাস কন্ডাক্টর রণবীর সিং যাদবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি এক মহিলা যাত্রীকে ১৫ পয়সার বদলে ১০ পয়সার টিকিট দিয়ে ৫ পয়সা নিজের পকেটে ভরেছেন। এই ‘বিরাট’ দুর্নীতির দায়ে ১৯৭৬ সালে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। শুরু হয় এক অসম লড়াই। নিজের সততা প্রমাণ করতে গিয়ে রণবীর কেবল চাকরিই হারাননি, হারিয়েছেন সামাজিক সম্মানও। এমনকি তাঁর নিজের সন্তানরাও তাঁকে সন্দেহ করত। ২০১৬ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “আমার সন্তানরাও জিজ্ঞেস করত আমি কী প্রতারণা করেছি? তাদের বোঝাতে হত আমি নির্দোষ।”
প্রশাসনিক জিঘাংসার চরম সীমা: মজার বিষয় হলো, এই ৫ পয়সার ‘তছরুপ’ প্রমাণ করতে ডিটিসি কর্তৃপক্ষ আইনি লড়াইয়ে খরচ করেছিল প্রায় ৪৭ হাজার টাকা! যে ৫ পয়সা ১৯৯৪ সালেই দেশ থেকে উঠে গিয়েছিল, তার জন্য ২০১৬ সাল পর্যন্ত মামলা টেনে নিয়ে যাওয়া হয়। রণবীরের স্ত্রী বিমলা দেবীর কথায়, “৫ পয়সা হোক বা ২ পয়সা, আমাদের ওপর দিয়ে যা গিয়েছে তা লক্ষ টাকার সমান।”
বিলম্বিত বিচার ও শেষ হাসি: অবশেষে ২০১৬ সালে দিল্লি হাইকোর্ট ডিটিসি-র আবেদন খারিজ করে রণবীরের পক্ষে রায় দেয়। আদালত নির্দেশ দেয় তাঁকে ৩০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ, ১.২৮ লক্ষ টাকা গ্র্যাচুইটি এবং ১.৩৭ লক্ষ টাকা সিপিএফ দিতে। যদিও চল্লিশ বছর পর পাওয়া এই টাকা তাঁর হারানো যৌবন বা সম্মান ফিরিয়ে দিতে পারবে না।
সোশ্যাল মিডিয়ায় জনৈক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “বড় দুর্নীতিবাজরা পার পেয়ে যায়, আর ৫ পয়সার জন্য একজন সাধারণ মানুষের জীবন নষ্ট করে দিল সিস্টেম।” রণবীর সিং যাদবের এই গল্প কেবল একটি আইনি লড়াই নয়, এটি একটি মানুষের নিজের সম্মান ও সততা ফিরে পাওয়ার জেদ, যা আজ বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে।