ভূ-গর্ভের শক্তির টানে দ্রুত সরছে পৃথিবীর চৌম্বকীয় উত্তর মেরু, কী বলছে বিজ্ঞানীরা?

শত শত বছর ধরে নাবিক আর অভিযাত্রীদের ধ্রুবতারার মতো পথ দেখানো পৃথিবীর চৌম্বকীয় উত্তর মেরু এখন আর নিজের জায়গায় স্থির নেই। গত কয়েক দশকে তা কানাডার সীমান্ত ছেড়ে অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটছে সাইবেরিয়ার দিকে। দীর্ঘ গবেষণার পর বিজ্ঞানীরা অবশেষে খুঁজে পেয়েছেন এই রহস্যময় ‘দৌড়ে’র আসল কারণ।
পৃথিবীর গভীরে অদৃশ্য লড়াই
বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার জিওসায়েন্স’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই স্থান পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছে থাকা দুটি শক্তিশালী চৌম্বকীয় তরঙ্গের ‘অদৃশ্য যুদ্ধ’। মূলত পৃথিবীর কেন্দ্রের বাইরের স্তরে থাকা গলিত লোহার প্রবাহই এই চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরি করে।
ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সির ‘সোয়ার্ম’ স্যাটেলাইটের ২০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন:
-
কানাডার পরাজয়: গত দুই দশকে কানাডার নিচের চৌম্বকীয় ক্ষেত্রটি দুর্বল হয়ে লম্বাটে হয়ে গেছে।
-
সাইবেরিয়ার টান: কানাডার নিচের গলিত পদার্থের পিণ্ডটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে শক্তিশালী অংশটি সাইবেরিয়ার দিকে সরে গেছে। ফলে উত্তর মেরু এখন সাইবেরিয়ার আকর্ষণে সেদিকেই ছুটছে।
বিস্ময়কর গতি ও প্রভাব
বিজ্ঞানীদের মতে, এই পরিবর্তনের গতি অস্বাভাবিক। ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে এই সরে যাওয়ার গতি বছরে ৯ মাইল থেকে বেড়ে একলাফে ৩৭ মাইল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। বর্তমানে এটি বছরে প্রায় ২৮ মাইল বেগে সাইবেরিয়ার দিকে এগোচ্ছে।
এর প্রভাব কিন্তু সুদূরপ্রসারী: ১. ন্যাভিগেশন সিস্টেম: সমুদ্রের জাহাজ থেকে শুরু করে আপনার পকেটে থাকা স্মার্টফোনের কম্পাস—সবকিছুই এই পরিবর্তনের ফলে প্রভাবিত হচ্ছে। ২. ম্যাপ আপডেট: দিকনির্ণয় ব্যবস্থা সচল রাখতে এনওএএ (NOAA) এবং ব্রিটিশ জিওলজিক্যাল সার্ভে ইতিমধ্যেই ‘ওয়ার্ল্ড ম্যাগনেটিক মডেল ২০২৫’ প্রকাশ করেছে।
ভবিষ্যৎ কী?
ইউনিভার্সিটি অফ লিডস-এর ভূ-পদার্থবিদ ফিল লিভারমোর জানিয়েছেন, তাদের গাণিতিক মডেল বলছে উত্তর মেরু সাইবেরিয়ার দিকেই এগিয়ে যাবে। তবে পৃথিবীর গভীরের এই জটিল প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একদম নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ২০১৭ সালে এটি প্রকৃত ভৌগোলিক মেরুর মাত্র ২৪০ মাইলের মধ্যে চলে এসেছিল, যা বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।