ফ্ল্যাট কেনার স্বপ্ন কি তবে আরও দামী? হরমুজ প্রণালীর যুদ্ধংদেহী মেজাজে মাথায় হাত মধ্যবিত্তের!

হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে পারস্য উপসাগরের নীল জলে ঘনিয়ে আসা যুদ্ধ মেঘ এখন নিঃশব্দে কড়া নাড়ছে ভারতীয় মধ্যবিত্তের ড্রয়িং রুমে। হরমুজ প্রণালীতে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও উত্তেজনার জেরে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে পণ্য পরিবহন বিঘ্নিত হচ্ছে। আর তার সরাসরি ও মারাত্মক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভারতের নির্মাণ ও আবাসন শিল্পে। বিশেষ করে মুম্বই, দিল্লি বা কলকাতার মতো বড় শহরগুলোতে নির্মাণ সামগ্রীর জোগান অনিয়মিত হয়ে পড়ায় প্রকল্পের খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনই পিছিয়ে যাচ্ছে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময়সীমা।
শিপিং ব্যাঘাতে বিপর্যস্ত সরবরাহ ব্যবস্থা হরমুজ প্রণালী হল বিশ্ব বাণিজ্যের লাইফলাইন। ভারত তার প্রয়োজনীয় খনিজ তেল এবং বহু নির্মাণ সামগ্রীর জন্য এই রুটের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে এই জলপথে অস্থিরতার কারণে জাহাজগুলোকে কয়েক হাজার মাইল পথ ঘুরে আসতে হচ্ছে। তথ্য বলছে, জাহাজগুলোকে এখন অতিরিক্ত ৬,০০০ থেকে ১০,০০০ নটিক্যাল মাইল পথ অতিক্রম করতে হচ্ছে। এর ফলে সামুদ্রিক জ্বালানির খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে—প্রতি টনে খরচ প্রায় ১ লাখ টাকা ছুঁয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধকালীন অতিরিক্ত ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম। স্বাভাবিকভাবেই আমদানিকৃত কাঁচামালের দাম হু হু করে বাড়ছে।
নির্মাণ সামগ্রীর অগ্নিমূল্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে স্টিল বা ইস্পাতের বাজারে। গত কয়েক সপ্তাহে ইস্পাতের দাম প্রায় ২০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিম এশিয়া থেকে অ্যালুমিনিয়াম সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় তার দামও চড়চড় করে বাড়ছে। পাশাপাশি, পিচ বা বিটুমেনের দাম আগে থেকেই ঊর্ধ্বমুখী ছিল, যা এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ডিজেলের দাম বেড়েছে, যার ফলে নির্মাণ সাইটে ব্যবহৃত ভারী যন্ত্রপাতি চালানো এবং পরিবহনের খরচ বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে।
বিলাসবহুল আবাসনে বড় সংকট এই সংকটের আঁচ সবচেয়ে বেশি লাগছে প্রিমিয়াম ও লাক্সারি আবাসন প্রকল্পগুলোতে। এই ধরনের প্রকল্পে মূলত ইতালিয়ান মার্বেল, বিদেশি ফিটিংস এবং উচ্চমানের কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়। আমদানিকৃত ইতালিয়ান স্ট্যাচুয়ারিও বা ক্যালাকাট্টা মার্বেলের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র শিপিং রুট পরিবর্তনের কারণে প্রতি বর্গফুটে অতিরিক্ত ৫০ থেকে ১৫০ টাকা খরচ বাড়ছে। এর ফলে ফিনিশড মার্বেলের দাম প্রতি বর্গফুটে ৬,০০০ টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। দক্ষিণ মুম্বই বা দক্ষিণ কলকাতার মতো এলাকায় যেখানে হাই-রাইজ প্রকল্পের সংখ্যা বেশি, সেখানে এই অতিরিক্ত খরচ বিল্ডারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
ভবিষ্যৎ কী? বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি যদি আরও কয়েক মাস স্থায়ী হয়, তবে ডেভেলপাররা বাধ্য হবেন ফ্ল্যাটের দাম বাড়াতে। একদিকে ঋণের চড়া সুদ, অন্যদিকে কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম—এই দ্বিমুখী চাপে জেরবার আবাসন শিল্প। সাধারণ ক্রেতাদের জন্য এর অর্থ হল, নিজের একটি মাথার ছাদ জোগাড় করতে এখন আরও বেশি টাকা খরচ করতে হবে। পাশাপাশি, অনেক প্রকল্প মাঝপথে থমকে যাওয়ার বা হস্তান্তরে দেরি হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালীর ঢেউ এখন ভারতীয় আবাসন বাজারের স্থিতিশীলতাকে টালমাটাল করে দিচ্ছে।