সাদ্দাম থেকে ইরান: কেরলের রাজনীতিতে কেন ফিকে হচ্ছে ‘উপসাগরীয়’ আবেগ?

কেরলের রাজনীতি আর মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা—এই দুইয়ের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। অতীতে আরব সাগরের ওপারের যুদ্ধ পরিস্থিতি কেরলের ভোটবাক্সে তুফান তুলত। কিন্তু ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে ছবিটা আমূল বদলে গিয়েছে। ১৯ ৯০ সালে যে বামপন্থীরা সাদ্দাম হোসেনকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে বাজিমাত করেছিল, আজ ইরান-ইজরায়েল সংঘাতের আবহে সেই সিবিএম-এর গলায় কেন ‘কৌশলী নীরবতা’?

ফিরে দেখা ১৯৯০: সাদ্দাম ম্যাজিক ও বামেদের উত্থান ১৯৯০ সালের জেলা পরিষদ নির্বাচনের সময় কেরলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল উত্তপ্ত। ইরাক যখন কুয়েত আক্রমণ করে, তখন ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ এবং ভিএস অচ্যুতানন্দনরা সরাসরি সাদ্দাম হোসেনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বামেদের যুক্তি ছিল, সাদ্দাম আসলে প্যালেস্তাইন ইস্যুকে বিশ্বের সামনে আনছেন এবং পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করছেন। এই কট্টর অবস্থান কেরলের মুসলিম ভোটারদের মন জয় করেছিল, যার ফলশ্রুতিতে জেলা পরিষদ নির্বাচনে বামেদের অভাবনীয় জয় আসে। যদিও ১৯৯১-এর বিধানসভা নির্বাচনে রাজীব গান্ধীর হত্যার আবেগে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জয়ী হয়, কিন্তু সাদ্দাম ইস্যু কেরলের রাজনীতিতে বামেদের জমি শক্ত করেছিল।

কেন এবার নীরব বামেরা? রাজনৈতিক বিশ্লেষক এম জয়াচন্দ্রনের মতে, ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধকে এবার ইস্যু করার ‘বিলাসিতা’ বামেরা দেখাতে পারছে না। এর পিছনে রয়েছে কয়েকটি অমোঘ কারণ:

  • শিয়া-সুন্নি বিভাজন: কেরলের মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকাংশ সুন্নি। ইরান একটি শিয়া প্রধান দেশ। ফলে ইরানের পক্ষে কট্টর অবস্থান নিলে সুন্নি ভোটারদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

  • অর্থনীতির টান: কেরলের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো উপসাগরীয় দেশগুলি (GCC) থেকে আসা রেমিট্যান্স। যুদ্ধের কারণে যদি এই দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয় বা সেখানকার প্রবাসী কেরলবাসীরা কাজ হারান, তবে রাজ্যের অর্থনীতি ভেঙে পড়বে।

  • ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডর: এই প্রস্তাবিত করিডর কেরলের ভিজিনজাম সমুদ্রবন্দরের জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। এই প্রকল্প চীন ও ইরানকে বাইপাস করে কেরলকে বিশ্ববাণিজ্যের মানচিত্রে তুলে ধরবে। সরকারের কাছে এখন আদর্শের চেয়ে আর্থিক উন্নয়ন বড় ইস্যু।

রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান সিপিএম এবার রাজপথে আমেরিকা-ইজরায়েলের বিরোধিতা করলেও নির্বাচনে একে প্রধান ইস্যু করছে না। ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ এই স্পর্শকাতর বিষয়ে নীরব থাকাই শ্রেয় মনে করেছে। অন্যদিকে জামাত-ই-ইসলামির মতো সংগঠনগুলি ইরানের পাশে থাকার বার্তা দিলেও সাধারণ জনমত এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতে চার্টার্ড বিমানে করে প্রবাসীরা ভোট দিতে আসতেন, কিন্তু এখন সেই জোয়ার অনেকটাই স্তিমিত। যুদ্ধের আবহে কেরলের রিয়েল এস্টেট ও বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমজনতা অনেক বেশি চিন্তিত। কয়েক দশকের ব্যবধানে কেরলের রাজনীতিতে ‘উপসাগরীয় আবেগ’ যে নির্বাচনী ময়দান থেকে অনেকটাই উধাও, তা বলাই বাহুল্য।