বিশ্ব বিখ্যাত পরিচালক হয়েও ২০ বছর ধরে গৃহবন্দী, কেন খামেইনির কড়া নজরে ছিলেন পানাহি?

মধ্যপ্রাচ্যে এখন শুধু মিসাইল আর ড্রোনের গর্জন। একদিকে ইজরায়েলের আক্রমণ, অন্যদিকে ইরানের নতুন সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনেইর কড়া অনুশাসন। কিন্তু এই বারুদের গন্ধের মাঝেও তেহরানের অলিগলি থেকে উঠে আসছে এক ভিন্ন প্রতিবাদের সুর। তিনি জাফর পানাহি—যাঁর ক্যামেরা যে কোনো পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বেশি ভয়ংকর ইরানের শাসকদের কাছে।
নিষেধাজ্ঞাই যাঁর হাতিয়ার: জাফর পানাহি কেবল একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাতা নন, তিনি ইরানের বর্তমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক জীবন্ত বিদ্রোহ। ২০০৯ সালের নির্বাচনের পর থেকেই তিনি সরকারের রোষানলে। ২০১০ সালে আদালত তাঁর ওপর ২০ বছরের জন্য সিনেমা নির্মাণ, সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং দেশত্যাগের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু শিল্পীকে কি এভাবে শিকল পরানো যায়?
পেন ড্রাইভে পাচার হওয়া সিনেমা: যখন ঘর থেকে বেরোনো বন্ধ, পানাহি তখন নিজের বাড়িকেই স্টুডিও বানিয়ে ফেললেন। ২০১১ সালে তৈরি করলেন ‘দিস ইজ নট এ ফিল্ম’। সেই সিনেমাটি একটি কেকের ভেতরে পেন ড্রাইভে লুকিয়ে পাচার করা হয়েছিল বিদেশে, যা পরে কান চলচ্চিত্র উৎসবে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন ফেলে দেয়।
ট্যাক্সি চালক থেকে প্রতিবাদী কণ্ঠ: ২০১৫ সালে তিনি নিজেই ট্যাক্সি চালক সেজে তেহরানের রাস্তায় গাড়ি চালিয়েছেন। গাড়িতে বসানো গোপন ক্যামেরায় সাধারণ মানুষের ভয়, ক্ষোভ আর সেন্সরশিপের গল্প তুলে ধরেন তাঁর ‘ট্যাক্সি’ সিনেমায়। তাঁর প্রতিটি কাজ—সেটি ‘থ্রি ফেসেস’ হোক বা ‘নো বিয়ারস’—বারবার রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করেছে: “ক্যামেরা বন্ধ করলেই কি সত্য থেমে যায়?”
যুদ্ধের আবহে কেন প্রাসঙ্গিক পানাহি? বর্তমানে ইরান যখন সামরিক ও রাজনৈতিক চাপে পিষ্ট, তখন ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর নজরদারি আরও কঠোর হয়েছে। দেশপ্রেমের নামে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা চলছে শিল্পীদের। কিন্তু পানাহির কাছে দেশপ্রেম মানে অন্ধ আনুগত্য নয়, বরং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা।
বিশ্বমঞ্চে সম্মান, নিজ দেশে জেল: কান, বার্লিন বা ভেনিস—বিশ্বের প্রতিটি বড় চলচ্চিত্র উৎসব তাঁকে শ্রেষ্ঠ সম্মান দিয়েছে। অথচ নিজের দেশে তাঁকে বারবার কারাবরণ ও নজরবন্দি হতে হয়েছে। আজ যখন সীমান্তে ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ছে, তখন পানাহির সিনেমাগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে যে—সীমান্ত ভাঙতে অস্ত্র লাগে, কিন্তু চিন্তার প্রাচীর ভাঙতে একটি ক্যামেরাই যথেষ্ট।
ইরানের উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে জাফর পানাহির এই লড়াই আজ কেবল একজন পরিচালকের গল্প নয়, এটি স্বাধীন কণ্ঠস্বরের এক অনন্য দলিল।