একই খাবার আর একই হাসি! দীর্ঘ দাম্পত্যে কেন ভাই-বোনের মতো দেখায় দম্পতিদের? আসল রহস্য ফাঁস

দীর্ঘকাল ধরে একটি ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, স্বামী-স্ত্রী দীর্ঘ সময় একসাথে থাকলে তাদের চেহারায় এক অদ্ভুত সাদৃশ্য তৈরি হয়। অনেক সময় মানুষ রসিকতা করে বলেন, “আপনাদের দুজনকে তো দেখতে পুরো ভাই-বোনের মতো!” আপাতদৃষ্টিতে এটি নিছক কথা মনে হলেও, মনোবিজ্ঞানী এবং সমাজবিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে বছরের পর বছর গবেষণা চালিয়েছেন। সম্প্রতি এই বিষয়ে কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে যা আমাদের দীর্ঘদিনের ধারণাকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।

মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বিখ্যাত গবেষণা ১৯৮৭ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দাবি করা হয়েছিল যে, দম্পতিরা যারা অন্তত ২৫ বছর ধরে সুখে সংসার করছেন, তাদের চেহারায় শারীরিকভাবে মিল লক্ষ্য করা যায়। গবেষকদের মতে, দম্পতিরা সময়ের সাথে সাথে একে অপরের আবেগের প্রতিফলন ঘটান। যদি একজন হাসেন, অন্যজনও প্রায়ই সেই একইভাবে হাসেন। এই ‘ইমোশনাল মিমিক্রি’ বা আবেগের অনুকরণের ফলে তাদের মুখের পেশিগুলো একইভাবে ব্যবহৃত হয়। ফলে বয়সের সাথে সাথে তাদের মুখে যে বলিরেখা বা ভাঁজ পড়ে, তার ধরণ অনেকটা একরকম হয়ে যায়।

জীবনযাত্রা ও পরিবেশের প্রভাব চেহারার এই মিলের পেছনে শুধুমাত্র আবেগ নয়, বরং অভিন্ন জীবনযাত্রার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। দীর্ঘ বছর ধরে একসঙ্গে থাকার ফলে দম্পতিরা একই ধরণের খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলেন। একই পরিবেশে বসবাস, একই আবহাওয়া এবং একই ধরণের শারীরিক পরিশ্রম তাদের ত্বকের মান, মেদ এবং সামগ্রিক দৈহিক গঠনে এক ধরণের সমতা নিয়ে আসে। গবেষকরা বলছেন, যারা একই ধরণের খাবার খান এবং একই পরিবেশে থাকেন, তাদের বার্ধক্যের প্রক্রিয়াটিও অনেকটা সমান্তরালভাবে চলে।

হোমোগ্যামি বা ‘নিজের মতো’ সঙ্গী খোঁজা বিজ্ঞানীরা আরও একটি মজার তথ্য দিয়েছেন, যাকে বলা হয় ‘হোমোগ্যামি’। মানুষ অবচেতনভাবেই এমন একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে পছন্দ করে, যার সাথে তার নিজের চারিত্রিক বা দৈহিক কিছুটা মিল রয়েছে। অর্থাৎ, বিয়ের শুরু থেকেই তাদের মধ্যে সূক্ষ্ম কিছু মিল থাকে, যা সময়ের সাথে সাথে মানুষের চোখে আরও প্রকট হয়ে ধরা দেয়।

আধুনিক গবেষণার ভিন্ন মত তবে সাম্প্রতিক কিছু আধুনিক গবেষণা এই পুরনো ধারণাকে কিছুটা চ্যালেঞ্জও করেছে। নতুন তথ্যানুযায়ী, স্বামী-স্ত্রীর চেহারা সময়ের সাথে সাথে নতুন করে বদলে গিয়ে এক হয়ে যায় না। বরং তারা একে অপরের মতো দেখতে কাউকে পছন্দ করে বলেই শুরুতে যে মিলটি ছিল, সেটিই আজীবন বজায় থাকে। দীর্ঘদিনের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা তাদের অভিব্যক্তিতে এমন এক প্রশান্তি নিয়ে আসে, যা বাইরের মানুষের কাছে তাদের চেহারার সাদৃশ্য হিসেবে ধরা দেয়।

পরিশেষে বলা যায়, চেহারার মিল থাকুক বা না থাকুক, একে অপরের প্রতি মানসিক টান এবং অভিন্ন জীবনবোধই একটি সফল দাম্পত্যের আসল চাবিকাঠি। তবে বিজ্ঞানের এই ব্যাখ্যাগুলি প্রমাণ করে যে, ভালোবাসা কেবল মনের গভীরেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা আমাদের অবয়বেও ছাপ ফেলে যায়।