জেল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ শিখরে: কীভাবে ‘বিপ্লবী’ থেকে ‘সুপ্রিম লিডার’ হয়ে উঠেছিলেন খামেনেই?

তেহরানের আকাশে আজ শোকের ছায়া, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় খামেনেই এক অনন্য নাম। ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল মাশহাদের এক রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম নেওয়া আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের উত্থান ছিল সাধারণ এক ধর্মীয় ছাত্র থেকে এক মহাশক্তিধর রাষ্ট্রনায়ক পর্যন্ত। রবিবার (১ মার্চ, ২০২৬) ইজরায়েল-আমেরিকার যৌথ হামলায় তাঁর প্রয়াণের পর এখন চর্চায় তাঁর সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক সফর।

বিপ্লবী সত্তা ও কারাবাস: খামেনেইয়ের রাজনীতির হাতেখড়ি গত শতাব্দীর ষাটের দশকে। ইরানের তৎকালীন শাসক শাহ মহম্মদ রেজা পাহলভির পশ্চিমী ঘেঁষা নীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন তিনি। আয়াতোল্লা রুহুল্লাহ খোমেনির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বিপ্লবী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই অপরাধে একাধিকবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয় এবং অকথ্য নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কিন্তু জেলখানাই তাঁকে আরও কট্টর ও জনপ্রিয় করে তোলে।

প্রেসিডেন্ট থেকে সুপ্রিম লিডার: ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর খামেনেই রাতারাতি ক্ষমতার অলিন্দে চলে আসেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৫ পর্যন্ত তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব সামলান। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সেই কঠিন সময়ে তাঁর নেতৃত্ব নজর কেড়েছিল। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর সংবিধান সংশোধন করে তাঁকে ‘সুপ্রিম লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হয়। যদিও তখন ধর্মীয় দিক থেকে তিনি সর্বোচ্চ ‘মারজা’ উপাধিধারী ছিলেন না, তবুও তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তাঁকে সেই আসনে বসায়।

ক্ষমতার শিখরে ও বিতর্ক: সুপ্রিম লিডার হিসেবে ইরানের সেনাবাহিনী (IRGC), বিচারব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমের ওপর তাঁর ছিল একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। একদিকে তিনি যেমন হিজবুল্লাহ ও হুথিদের মতো গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের দাপট বাড়িয়েছিলেন, অন্যদিকে তেমনই দেশের ভেতর বিরোধীদের দমনে ছিলেন কঠোর। ২০০৯ সালের নির্বাচন পরবর্তী বিক্ষোভ বা ২০২২ সালের মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর হিজাব বিরোধী আন্দোলন— সবক্ষেত্রেই তাঁর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে ‘ইতিহাসের শয়তান মানুষ’ বললেও, অনুগামীদের কাছে তিনি ছিলেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি। তাঁর মৃত্যুতে ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষিত হলেও, বিশ্ব রাজনীতির এক অধ্যায়ের অবসান ঘটল তা নিশ্চিত।