ছেলের দেখা মিলল ঠিকই, কিন্তু ঠাঁই হলো না ভিটেয়! ২৫ বছর পর এক অভাগী মায়ের করুণ পরিণতি

২৫ বছর। আড়াই দশক ধরে একটিবার নিজের রক্তকে দেখার জন্য চোখ চেয়ে বসেছিলেন বৃদ্ধা। হ্যাম রেডিওর সৌজন্যে সেই অসাধ্য সাধনও হলো। কিন্তু শেষমেশ মায়ের সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর বুকভরা ভালোবাসার সামনে ‘পাথরের দেওয়াল’ হয়ে দাঁড়িয়ে গেল ধর্ম! ঝাড়খণ্ডের এক বৃদ্ধার এই লড়াই আজ যেন মানবিকতার সব সংজ্ঞাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত ও ভিটেছাড়া হওয়া:
বৃদ্ধার বয়স এখন সত্তরের কোঠায়। ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা জেলার দাহুপাগর গ্রামের এক ভরা সংসারে একসময় দিন কাটত তাঁর। বিয়ের আগেই তিনি খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু হিন্দু স্বামীর মৃত্যুর পরই তাঁর জীবনে নেমে আসে অন্ধকারের কালো ছায়া। অভিযোগ, প্রতিবেশী ও স্বজনরা একজন খ্রিস্টান মহিলাকে মেনে নিতে রাজি হয়নি। শুরু হয় অমানবিক অত্যাচার, যার জেরে একসময় তিনি ভিটেছাড়া হন। স্মৃতি ঝাপসা হয়ে যাওয়ায় তিনি কীভাবে কলকাতায় পৌঁছেছিলেন, তা আজ আর কারোরই মনে নেই।

আশ্রয় ও দীর্ঘ একাকীত্বের অবসান:
২০০১ সালে মিশনারিজ অফ চ্যারিটির সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে একটি হোমে ঠাঁই দেন। সেই থেকে হোমের চার দেওয়ালই ছিল তাঁর একমাত্র পৃথিবী। কিন্তু সম্প্রতি হ্যাম রেডিও ওয়েস্টবেঙ্গল ক্লাবের সম্পাদক অম্বরীশ নাগ বিশ্বাস এবং তাঁর দল নতুন করে আশার আলো দেখান। বহু অনুসন্ধানের পর তাঁরা দাহুপাগর গ্রামে বৃদ্ধার সেই নাড়িছেঁড়া ধন—অর্থাৎ তাঁর ছেলের খোঁজ পান।

মা ও ছেলের মুখোমুখি সাক্ষাত ও নিষ্ঠুর শর্ত:
ভিডিয়ো কলের মাধ্যমে দীর্ঘ ২৫ বছর পর মা ও ছেলের মহামিলন হওয়ার কথা ছিল। স্ক্রিনে যখন চোখের সামনে ছেলের মুখ ভেসে উঠল, তখন বৃদ্ধার দু’চোখ ঝরছিল পরম তৃপ্তিতে। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ছেলে স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, মা যদি ফিরতে চান, তবে তাঁকে খ্রিস্ট ধর্ম ত্যাগ করে হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করতে হবে। নাহলে বাড়ির দরজা তাঁর জন্য বন্ধ।

আত্মসম্মানে অবিচল বৃদ্ধা:
ছেলের এই নিষ্ঠুর শর্ত শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে যান বৃদ্ধা মা। কিন্তু বুকফাটা কষ্ট নিয়েও তিনি নিজের বিশ্বাসের কাছে হার মানেননি। অশ্রুভেজা চোখে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, “ছেলে বলেছে ধর্ম না বদলালে আমায় নেবে না। কিন্তু আমি আমার ধর্ম ছাড়ব না। এটাই ওর সঙ্গে আমার শেষ কথা।”

মানবিকতা আজ কাঠগড়ায়:
শত শত মানুষকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া অম্বরীশবাবু নিজেও আজ স্তব্ধ। তিনি বলেন, “রক্তের সম্পর্কের চেয়েও ধর্ম বড় হয়ে উঠল, এটা ভাবতে পারছি না।” তবে তিনি হাল ছাড়তে নারাজ। তাঁর বিশ্বাস, একদিন এই বিভেদের প্রাচীর ভাঙবে এবং মা তাঁর ঘরে ফিরবেন। আপাতত কলকাতার হোমে বসেই সেই অভাগী মা নিজের বিশ্বাসের ওপর ভর করে বেঁচে আছেন, যেখানে নিজের নাড়িছেঁড়া ধনও আজ ধর্মের নিক্তিতে মাকে মাপছে।