বাংলাদেশে বিএনপির জয়, না কি জামায়াতের বিপজ্জনক উত্থান? ভারতের জন্য কেন ঘনাচ্ছে বিপদের মেঘ?

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল শুধু ওপার বাংলায় নয়, ভারতের রাজনীতিতেও বড়সড় কম্পন সৃষ্টি করেছে। বিএনপি একক সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ঘুম কেড়েছে জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় শক্তিবৃদ্ধি। ২১২ আসন নিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় ফিরলেও, ৬৭ আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে জামায়াতের আত্মপ্রকাশ দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করল।
ভারতের দুশ্চিন্তার কারণ কী? বিশ্লেষক অর্ণব সাহার মতে, জামায়াতের এই উত্থান ভারতের জন্য নিশ্চিতভাবেই ‘শিরঃপীড়ার কারণ’। এর পেছনে কাজ করছে একাধিক ফ্যাক্টর:
-
সংখ্যালঘু ও লিবারাল বিদ্বেষ: জামায়াত ঐতিহাসিকভাবেই হিন্দু, বৌদ্ধ এবং প্রগতিশীল মুসলিমদের প্রতি রক্ষণশীল ও আক্রমণাত্মক মনোভাব পোষণ করে। তাদের আস্তিনে থাকা ‘বিষাক্ত সাম্প্রদায়িক তাস’ যে কোনো সময় বিএনপি সরকারকে চাপে ফেলতে পারে।
-
নারীবিদ্বেষী রাজনীতি: এই নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী তালিকায় একজনও মহিলা ছিলেন না। এই কট্টরপন্থী মানসিকতা আধুনিক গণতন্ত্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
-
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রভাব: ওপার বাংলায় জামায়াতের মতো কট্টর শরীয়তি শক্তির শক্তিবৃদ্ধি পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন তৃণমূলের বিকল্প হতে চাওয়া বিজেপির মতো ‘হিন্দুত্ববাদী’ শক্তির ইকোসিস্টেমকে এটি পরোক্ষভাবে পুষ্ট করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জুলাই অভ্যুত্থান ও জামায়াতের ‘ডিজাইন’: জুলাই মাসের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান কি তবে জামায়াতের একটি সুপরিকল্পিত ছক ছিল? নির্বাচনের ফলাফল সেই প্রশ্নকেই জোরালো করেছে। ছাত্র আন্দোলনের অংশ হওয়া এনসিপি-র বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধেছে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রগতিশীল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জামায়াতপন্থী ‘ছাত্রশিবিরের’ জয় প্রমাণ করে, তারা অত্যন্ত সংগোপনে যুবসমাজের গভীরে শিকড় গেড়েছে।
তারেক রহমানের ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ম্যাজিক: বিএনপি নেতা তারেক রহমানের জয়কে ত্বরান্বিত করেছে তাঁর ঘোষণা করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্প। পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর আদলে তৈরি এই প্রকল্পে মহিলাদের মাসিক ২৫০০-৩০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বিএনপিকে বিপুল মহিলা ভোট এনে দিয়েছে।
উপসংহার: বিএনপির জয় আপাতত বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে স্বস্তি আনলেও, জামায়াতের ‘প্রবল নির্ণায়ক শক্তি’ হয়ে ওঠা আগামীর জন্য অশনি সংকেত। ধর্মীয় আত্মপরিচিতির এই রাজনীতি কেবল বাংলাদেশ নয়, ভারত তথা গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লিবারেল চেতনার কাছে এক বড় পরীক্ষা।