রাস্তা বা মেট্রো, সরানো যায়নি এক ইঞ্চিও! কলকাতার এই মন্দিরের ভয়ে কেন থমকে গিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী?

কলকাতার ব্যস্ততম শোভাবাজার মোড় দিয়ে যাতায়াতের সময় লাল রঙের ছোট্ট একটি মন্দির নিশ্চয়ই আপনার চোখে পড়েছে। ট্রাফিক জ্যাম আর হাজার হাজার মানুষের ভিড়ের মাঝে এই মন্দিরটি যেন এক রহস্যময় স্তব্ধতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, রাস্তার ঠিক মাঝখানে এই মন্দিরটি কেন? কেনই বা আধুনিক নগর পরিকল্পনার স্বার্থেও এটিকে সরানো সম্ভব হয়নি? এর নেপথ্যে রয়েছে রক্ত হিম করা ইতিহাস এবং স্বয়ং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত।
জনশ্রুতি অনুযায়ী, কয়েক শতাব্দী আগে এই শোভাবাজার এলাকায় এক নিষ্ঠাবান পূজারী অত্যন্ত সাধারণভাবে মা কালীর আরাধনা করতেন। তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চল ছিল শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রতাপশালী রাজা নবকৃষ্ণ দেবের শাসনাধীন। বিনা অনুমতিতে তাঁর এলাকায় এই পুজো হচ্ছে জেনে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন রাজা। অহংকারের বশবর্তী হয়ে তিনি নির্দেশ দেন প্রতিমাটি সরিয়ে ফেলার। কথিত আছে, রাজার অনুচরেরা রাতের অন্ধকারে মা কালীর মূর্তিটি তুলে নিয়ে গিয়ে পাশের একটি পুকুরে ফেলে দেয়।
কিন্তু সেই রাতেই ঘটে অলৌকিক ঘটনা। পূজারীকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে দেবী নির্দেশ দেন তাঁকে পুকুর থেকে উদ্ধার করার জন্য। পরদিন সকালে দেখা যায়, অতল জলে নিমজ্জিত থাকলেও মা কালীর মূর্তিতে একটি আঁচড়ও লাগেনি। এই অলৌকিক ঘটনায় ভীত ও স্তম্ভিত হয়ে রাজা নবকৃষ্ণ দেব নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দান করেন। সেই থেকেই এই ‘লাল মন্দির’ বিশ্বাসের এক অটুট স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সময়ের সাথে কলকাতা আধুনিক হয়েছে, বেড়েছে যানবাহন। রাস্তা প্রশস্ত করার প্রয়োজনে বহুবার এই মন্দিরটি সরানোর পরিকল্পনা করেছে প্রশাসন। স্থানীয়দের দাবি, যতবারই মন্দির সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, ততবারই ঘটেছে কোনো না কোনো ভয়াবহ দুর্ঘটনা। শোনা যায়, একবার মন্দির সরাতে গিয়ে এক শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছিল। এরপর থেকে স্থানীয় মানুষ এবং প্রশাসনের মধ্যে এক অলৌকিক আতঙ্ক দানা বাঁধে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অধ্যায়টি শুরু হয় কলকাতা মেট্রো রেল প্রকল্পের সময়। নকশা অনুযায়ী, সুড়ঙ্গ বা রাস্তার প্রসারণের পথে মন্দিরটি প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কান পর্যন্ত পৌঁছায়। অলৌকিক কাহিনী এবং জনরোষের কথা বিবেচনা করে ইন্দিরা গান্ধী স্পষ্ট নির্দেশ দেন, “মন্দির ভাঙা যাবে না।” তাঁর নির্দেশে কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত খরচ করে এবং নকশায় আমূল পরিবর্তন এনে মন্দিরটিকে অক্ষত রাখা হয়। আজও শোভাবাজারের এই লাল মন্দির কলকাতার ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যাকে সরানোর সাহস পায়নি কোনো আধুনিক শক্তি।