জনসংখ্যায় ধস! ইতিহাসের গভীরতম সংকটে চীন, ভারতের পর এবার কি অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই জিনপিংয়ের?

এক সময়ের বিশ্বের জনবহুল দেশ চীন এখন এক ভয়াবহ জনতাত্ত্বিক বা ডেমোগ্রাফিক সংকটের মুখে। ২০২৫ সালের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশটির জন্মহার রেকর্ড সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে। জন্মহার কমার এই ধারা টানা চতুর্থ বছর বজায় থাকায় চীনের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি এবং সামাজিক কাঠামো নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা: সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনে প্রতি ১০০০ জনে জন্মহার নেমে এসেছে ৫.৬৩-এ। ২০২৩ সালে যা ছিল ৬.৩৯। অর্থাৎ গত এক দশকের ধারাবাহিক পতন অব্যাহত রয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, গত বছর চীনে শিশু জন্মেছে ৭৯.২ মিলিয়ন, কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা ১ কোটি ১৩ লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে চীনের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩৩.৯ মিলিয়ন হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে ভারতের পর দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের জনসংখ্যা প্রায় ১.৪ বিলিয়ন।

কেন এই পতন? বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে চলা কঠোর ‘এক সন্তান নীতি’ (One Child Policy) এই সংকটের প্রধান অনুঘটক। যদিও ২০১৬ সালে এই নীতি বাতিল করা হয়েছে, তবুও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বর্তমানে চীনের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিয়ের প্রতি অনীহা, আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার খরচ, শিক্ষার উচ্চ ব্যয় এবং আবাসন সংকটের কারণে সন্তান ধারণে আগ্রহ কমছে। বিশেষ করে নারীদের ওপর কর্মক্ষেত্র ও শিশু পালনের দ্বৈত চাপ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

অর্থনীতিতে অশনি সংকেত: ২০২৫ সালে চীনের জিডিপি ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলেও, জন্মহার হ্রাস দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যাবিদ ই ফুতিয়ানের মতে, শিশুরা হলো সমাজের বৃহত্তম ভোক্তা। অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমলে চীনকে সম্পূর্ণভাবে রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল হতে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। অন্যদিকে, ২০২৫ সালে ৬০ বছর ঊর্ধ্ব জনসংখ্যার হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ শতাংশে। জাতিসংঘের অনুমান, ২১০০ সালের মধ্যে চীনের অর্ধেক জনসংখ্যাই প্রবীণ হয়ে পড়বে।

রক্ষাকবচ খুঁজছেন জিনপিং: প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই সংকটকে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র ইস্যু হিসেবে দেখছেন। দম্পতিদের উৎসাহিত করতে সরকার বর্তমানে কর ছাড়, আবাসন সহায়তা, তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য নগদ অর্থ এবং দীর্ঘ মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো একগুচ্ছ সুবিধা দিচ্ছে। তবুও বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে কেবল আর্থিক প্রণোদনায় এই ধস ঠেকানো প্রায় অসম্ভব।