ভাইরাল হওয়ার নেশায় কি ধ্বংস হচ্ছে সমাজ? বিবেকের মৃত্যু হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়

হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোন আর এক ক্লিকেই বিশ্বজুড়ে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা— সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, কিন্তু এর দায়িত্বহীন ব্যবহার এখন আধুনিক সমাজের জন্য বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যের অবাধ প্রবাহের ভিড়ে আজ সত্য এবং মিথ্যার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।

যাচাইহীন তথ্যের মরণফাঁদ: বর্তমান সময়ে যেকোনো আবেগপ্রবণ বা উসকানিমূলক খবর দেখলেই সাধারণ মানুষের মধ্যে তা যাচাই না করে শেয়ার করার এক প্রবল প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কোনো ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে অপদস্থ করা বা ধর্ম-রাজনীতির মতো সংবেদনশীল বিষয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি ছড়ানো এখন এক শ্রেণির মানুষের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একটি ভুল তথ্য যে কতটা ভয়াবহ দাঙ্গা বা ব্যক্তিগত সম্মানহানি ঘটাতে পারে, তা অনেক সময় শেয়ারকারীর কল্পনাতেও থাকে না।

অ্যালগরিদম ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা: সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি যে আপনি যা দেখতে পছন্দ করেন, আপনার সামনে সেই ধরনের কনটেন্টই বারবার আনা হয়। এতে আপনি সত্যের অন্য পিঠটি দেখার সুযোগ হারান। অন্যদিকে, মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর মধ্যে ‘কে আগে ব্রেকিং নিউজ দেবে’—এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটাচ্ছে। অনেক সময় দ্রুত ভিউ পাওয়ার লোভে সংবাদমাধ্যমগুলোও অপরিপক্ব তথ্য পরিবেশন করে বসে।

প্রযুক্তির অপব্যবহার ও ফেক ফটোকার্ড: আজকাল মূলধারার জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে ‘ফেক ফটোকার্ড’ বা গ্রাফিক কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে। সাধারণ পাঠক লোগো দেখে সহজেই বিশ্বাস করে ফেলেন যে তথ্যটি সত্য। ডিজিটাল ফরেনসিক জ্ঞান বা ছবি যাচাইয়ের টুল সম্পর্কে সচেতনতার অভাবেই সাধারণ মানুষ বারবার এই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।

উত্তরণের পথ কী? গুজব রুখতে ডিজিটাল জালিয়াতির বিরুদ্ধে সরকারের কড়া নজরদারি ও আইনের কঠোর প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। তবে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে ব্যবহারকারী বা পাঠকদের। কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে নিজেকে ৩টি প্রশ্ন করুন: ১. তথ্যের উৎস কী? (এটি কি কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের খবর?) ২. তথ্যটি কি অতিমাত্রায় উসকানিমূলক? (আবেগ দিয়ে নয়, বুদ্ধি দিয়ে বিচার করুন।) ৩. শেয়ার করলে কার লাভ? (এটি কি কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর প্রোপাগান্ডা?)

সম্পাদকীয় বার্তা: সচেতনতা, যাচাই এবং ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা— এই তিনের সমন্বয়ই পারে তথ্য-সন্ত্রাস রুখতে। মনে রাখবেন, একটি ভুল শেয়ার আপনার অজান্তেই আপনাকে অপরাধের অংশীদার করে তুলতে পারে। ডিজিটাল নাগরিক হিসেবে দায়িত্বশীল হওয়ার সময় এখনই।