নিজের চোখের সামনে বলি দিয়েছিলেন সন্তানদের, হিন্দুধর্ম রক্ষায় গুরু গোবিন্দ সিংয়ের আত্মত্যাগ কি আজ ভুলে যাচ্ছে দেশ?

আজ ২৭ ডিসেম্বর, শিখদের দশম গুরু, বীর যোদ্ধা এবং আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক গুরু গোবিন্দ সিং জির পবিত্র প্রকাশ পর্ব। ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে পাটনা সাহেবের পুণ্যভূমিতে তাঁর জন্ম। শৈশবে যাঁর নাম ছিল গোবিন্দ রাই, সময়ের প্রয়োজনে তিনিই হয়ে ওঠেন মুঘল ত্রাস এবং ‘খালসা পন্থ’-এর প্রতিষ্ঠাতা। আজ যখন গোটা বিশ্ব তাঁর জন্মজয়ন্তী পালন করছে, তখন তাঁর শৌর্য ও আত্মত্যাগের কাহিনী প্রতিটি ভারতবাসীর রক্তে শিহরণ জাগায়।
৯ বছর বয়সেই কাঁধে গুরুদায়িত্ব: কাশ্মীরি পণ্ডিতদের ধর্ম রক্ষার্থে নিজের প্রাণ বলি দিয়েছিলেন তাঁর পিতা তথা নবম শিখ গুরু তেগ বাহাদুর জি। মাত্র ৯ বছর বয়সেই গুরু গোবিন্দ সিং জির কাঁধে আসে শিখ সম্প্রদায়ের নেতৃত্বের ভার। তিনি কেবল অস্ত্রশস্ত্র বা ঘোড়সওয়ারিতেই পারদর্শী ছিলেন না, বরং পাঞ্জাবি, সংস্কৃত, ফারসি ও ব্রজ ভাষার এক অসামান্য পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর দরবারে সর্বদা ৫২ জন কবির উপস্থিতি থাকত, যে কারণে তাঁকে ‘সন্ত সিপাহি’ হিসেবেও ভূষিত করা হয়।
মুঘলদের পরাজয় ও অজেয় বীরত্ব: আনন্দপুর সাহেবের মাটিতে গুরু গোবিন্দ সিং জির বীরত্বগাথা আজও অমর। ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র হাতেগোনা শিখ যোদ্ধা ১০ হাজার মুঘল সেনাকে রণক্ষেত্র ছেড়ে পালাতে বাধ্য করেছিলেন। ঔরঙ্গজেবের বিশাল বাহিনীকে বারবার ধুলো খাইয়েছিলেন তিনি। ১৬৯৯ সালে তিনি ‘পাঞ্জ পেয়ারে’ নির্বাচনের মাধ্যমে ‘খালসা পন্থ’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং শিখদের জন্য ‘পঞ্চ ককার’ (কেশবিন্যাস, কড়া, কৃপাণ, চিরুনি ও কচ্ছ) ধারণ বাধ্যতামূলক করেন। তাঁর সেই কালজয়ী রণধ্বনি ‘ওয়াহে গুরু জি কা খালসা, ওয়াহে গুরু জি কি ফতেহ’ আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণা জোগায়।
পরিবার বিসর্জন ও ধর্মের জয়: ধর্ম রক্ষার লড়াইয়ে গুরু গোবিন্দ সিং জি তাঁর পুরো পরিবারকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাঁর দুই পুত্র অজিত সিং ও জুঝার সিং চমকৌরের যুদ্ধে শহীদ হন। ছোট দুই সাহেবজাদা জোরাওয়ার সিং এবং ফতেহ সিংকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে অস্বীকার করায় জ্যান্ত দেওয়ালের ভেতর গেঁথে দেওয়া হয়। নিজের সন্তানদের এই চরম আত্মত্যাগ দেখেও তিনি ভেঙে পড়েননি। ১৭০৮ সালে মহারাষ্ট্রের নান্দেড়ে মহাপ্রয়াণের আগে তিনি ‘গুরু গ্রন্থ সাহেব’কেই শিখদের চিরস্থায়ী গুরুর মর্যাদা দিয়ে যান। তাঁর জীবন দর্শন আজও আমাদের শেখায়—নিজে ভয় পাবে না, অন্যকেও ভয় দেখাবে না।