টি বোর্ডের দীর্ঘসূত্রিতা, উত্তরবঙ্গের চা-শিল্পে আটকে ৪00 কোটি টাকার ভর্তুকি, শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কায় শিল্পমহল

উত্তরবঙ্গের অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড চা-শিল্প বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। অভিযোগ, চা-গাছ প্রতিস্থাপন বা ‘রিপ্লান্টিং’ এবং পুরনো গাছ উপড়ে ফেলা বা ‘আপরুটিং’-এর জন্য বরাদ্দ প্রায় ৪০০ কোটি টাকার সরকারি ভর্তুকি দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া পড়ে আছে। এই বিপুল আর্থিক অনটনের জেরে ডুয়ার্স ও তরাইয়ের একাধিক চা-বাগান কার্যত ধুঁকছে, যার ফলে আগামী দিনে বড়সড় শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা করছে শিল্পমহল।
টি বোর্ডের লাল ফিতের ফাঁস চা-শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা এই পরিস্থিতির জন্য সরাসরি টি বোর্ড অফ ইন্ডিয়ার (Tea Board of India) লাল ফিতের ফাঁসকে দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ, উৎপাদনশীলতা বজায় রাখতে চা-বাগান মালিকরা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে পুরনো গাছ উপড়ে নতুন চারা রোপণ (আপরুটিং ও রিপ্লান্টিং) করেছেন। টি-বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, এই কাজের জন্য হেক্টর প্রতি একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়ার কথা ছিল। টি-বোর্ডের আধিকারিকরা কাজ পরিদর্শনের পরও এখনও পর্যন্ত কোনো বাগানই তাদের প্রাপ্য টাকা হাতে পায়নি।
শিল্প মহলের সূত্রে খবর, উত্তরবঙ্গের অন্তত ৮০টি বড় চা-বাগান বর্তমানে এই বকেয়া টাকার অভাবে আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। একদিকে বাড়তে থাকা উৎপাদন খরচ, অন্যদিকে পুরনো গাছের কারণে কমে আসা ফলন—এই দ্বিমুখী চাপে বাগান চালানো দায় হয়ে উঠেছে।
ভবিষ্যতের জন্য ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত তরাই ইন্ডিয়ান প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহেন্দ্র বনশল গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “যদি টি-বোর্ড প্রাপ্য সাবসিডি অবিলম্বে না-ছাড়ে, তবে আগামী দিনে চা-গাছের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। আর বাগানে গাছের সংখ্যা কমলে স্বাভাবিকভাবেই শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা কমবে। এর সোজা অর্থ হল শ্রমিক ছাঁটাই। এটা চা-শিল্পের ভবিষ্যতের জন্য এক ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত।”
ইন্ডিয়ান টি-প্ল্যান্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ITPA) ডুয়ার্স শাখার সচিব রাম অবতার শর্মাও একই সুর মিলিয়ে বলেন, “এই মুহূর্তে এই সাবসিডি-র টাকাই বাগানগুলির টিকে থাকার শেষ ভরসা। যারা নিয়ম মেনে কাজ করেছে, তারা যদি প্রাপ্য টাকাটুকু পেত, তবে অনেক রুগ্ন বাগান ঘুরে দাঁড়াতে পারত।”
মালিকপক্ষের দাবি, এই মুহূর্তে বকেয়া ৪00 কোটি টাকা ছাড়লে, তা মরণাপন্ন চা-শিল্পের কাছে ‘অক্সিজেন’-এর কাজ করবে।
আইনি পথেও মেলেনি সুরাহা বকেয়া ভর্তুকি আদায়ের দাবিতে এর আগে একটি চা-বাগানের মালিকপক্ষ কলকাতা হাইকোর্টের জলপাইগুড়ি সার্কিট বেঞ্চে মামলা দায়ের করেছিল। কিন্তু আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দেওয়ায় আইনি পথেও কোনো সুরাহা মেলেনি। হতাশ বাগান মালিকরা এখন ফের টি-বোর্ডের কাছেই মানবিক আবেদন জানাচ্ছেন।
তাদের বক্তব্য, টি-বোর্ড যদি দ্রুত এই বিষয়টি পুনর্বিবেচনা না-করে এবং সরেজমিনে কাজের প্রমাণ দেখে টাকা ছাড়ার ব্যবস্থা না-করে, তবে উত্তরবঙ্গের চা-বলয়ে বড়সড় বিপর্যয় নেমে আসবে। হাজার-হাজার শ্রমিকের রুজিরুটি এবং শতাব্দীপ্রাচীন এই শিল্পের ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে এই ৪00 কোটি টাকার উপরেই।