‘কোথায় যাব আমরা?’, দিল্লি-মুম্বই ঘুরে দুর্গাপুরের যৌনপল্লিতে ঠিকানা, ভোটাধিকার প্রমাণ করতে নাজেহাল হাজারো মহিলা!

দুর্গাপুরের কাদা রোড যৌনপল্লির প্রায় হাজারখানেক মহিলা বর্তমানে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত ডিএসপি কারখানার গা-ঘেঁষে প্রায় ৫০ বছর আগে গড়ে ওঠা এই পল্লির বাসিন্দাদের মূল প্রশ্ন, “আমাদের কী হবে? ২০০২-এর ভোটার তালিকায় তো আমার নাম নেই, তাহলে?” তাদের অনেকেই দীর্ঘকাল আগে বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন বা তাঁদের জীবিত-মৃত থাকার খবরও জানেন না। কলকাতা, মুম্বই, দিল্লি সহ বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে কাদা রোডে স্থায়ী ঠিকানা খুঁজে পাওয়ায় তাঁদের অনেকের কাছেই নেই কোনও পরিচয়পত্র, এমনকি বহু বছর তাঁরা কোথাও ভোটও দেননি।
এই যৌনপল্লির অধিকাংশ বাসিন্দাই রাজ্যের বিভিন্ন জেলা (বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ, মালদা, উত্তরবঙ্গ) বা পার্শ্ববর্তী অসম ও দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছেন। অপহরণ বা কৈশোরে বাড়ি ছেড়ে আসার কারণে অনেকেই তাঁদের বাবা-মায়ের মুখ দেখেননি বা পরিবারের সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগাযোগ নেই। ফলে কমিশনের চাওয়া ২০০২ সালের এসআইআর নথিতে বাবা-মা বা নিকটাত্মীয়ের নাম খুঁজে পাওয়া তাঁদের পক্ষে অসম্ভব। পাশাপাশি, ভোটাধিকার প্রমাণের জন্য নির্বাচন কমিশন নির্দেশিত ১১টি নথির কোনোটিই এই মহিলাদের কাছে নেই।
কাদা রোড যৌনপল্লি দুর্গাপুর পুরনিগমের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এবং এখানকার বাসিন্দারা ৬৭ ও ৬৮ নম্বর বুথে ভোট দেন। বর্তমানে প্রায় ৮০ শতাংশ যৌনকর্মী ভোটার হলেও, নতুন তালিকার জন্য এনুমারেশন ফর্ম পাওয়ার পর তাঁদের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। মুর্শিদাবাদের বাসন্তী মণ্ডল (ছদ্মনাম), যাঁর বয়স প্রায় ৪০, ১৭ বছর বয়সে কাজ পাইয়ে দেওয়ার নাম করে রাজস্থানের যৌনপল্লিতে বিক্রি হয়ে গিয়েছিলেন। দিল্লি-কলকাতা ঘুরে বর্তমানে তাঁর ঠিকানা কাদা রোড। তাঁর মতো কয়েকশো যৌনকর্মী একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন।
এই কঠিন পরিস্থিতিতে যৌনকর্মী ও তাঁদের পরিবারকে ভোটাধিকার সুরক্ষিত রাখতে স্বশাসিত সংস্থা ‘দুর্বার’ দায়িত্ব নিয়েছে। দুর্বার সংস্থার সদস্য তরুণ রায় স্বীকার করেন, “যৌনপল্লির মহিলারা চরম আতঙ্কিত। পরিবারে যোগাযোগ না-থাকা এবং বিভিন্ন রাজ্য ঘুরে আসার ফলে পূর্বে কোথাও ভোটার তালিকায় নাম না-থাকাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।” অন্যদিকে, দুর্গাপুর পুরনিগমের ডেপুটি চেয়ারপার্সন ধর্মেন্দ্র যাদব কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করে বলেন, “কেন্দ্রীয় সরকার কোনও পরিকাঠামো না-তৈরি করে এরকম বহু যৌনকর্মীকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমরা ওঁদের পাশে আছি।” মহকুমা শাসক সুমন বিশ্বাস দ্রুত বুথের বিএলও-দের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন। তবে, কাদা রোড যৌনপল্লিতে এখনও শোনা যাচ্ছে একটাই ফিসফিসানি, “আমরা কোথায় নথি পাব? আমাদের কী হবে?”