বিশেষ: তেজস্বীকে কেন রিজেক্ট করল বিহার? জেনেনিন পরাজয়ের ৫ কারণ

বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রায় স্পষ্ট। দুপুর সাড়ে ১২টার হিসাব অনুযায়ী, যখন এনডিএ জোট ১৯২টি আসনে এগিয়ে, তখন মহাজোট মাত্র ৪৬টি আসনে আটকে। বিহারের জনগণ কার্যত বিরোধী জোটকে পরিত্যাগ করেছে। যে নেতা ভোটের দিন পর্যন্ত জয়ের দাবি করেছিলেন, তাঁর এই মুখ থুবড়ে পড়ার কারণ কী? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তেজস্বী যাদবের পরাজয়ের নেপথ্যে রয়েছে মূলত ৫টি কৌশলগত ত্রুটি।
১. মাত্রাতিরিক্ত যাদব প্রার্থী: ফিরিয়ে আনল ‘যাদব রাজের’ গন্ধ
পরাজয়ের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে আরজেডি-র ৫২ জন যাদব প্রার্থীকে টিকিট দেওয়ার সিদ্ধান্তকে।
-
ভোটব্যাঙ্ক: আরজেডি ১৪৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল, যার মধ্যে প্রায় $36\%$ (৫২ জন) ছিল যাদব প্রার্থী। এটি ২০২০ সালের ৪০ জন যাদব প্রার্থীর থেকেও বেশি।
-
বিপর্যয়: এই সংখ্যাবৃদ্ধি দলের জাতিবাদী প্রতিচ্ছবি আরও স্পষ্ট করেছে। এতে অ-যাদব ভোটব্যাঙ্ক প্রায় সম্পূর্ণ সরে যায়। মানুষ এতে ‘যাদব রাজের’ গন্ধ খুঁজে পেয়েছে, যার ফলে ভিন জাতির ভোটাররা তেজস্বীর উপর ভরসা রাখতে পারেননি।
-
তুলনা: বিশ্লেষকরা মনে করছেন, উত্তরপ্রদেশে অখিলেশ যাদব লোকসভা নির্বাচনে মাত্র ৫ জন যাদবকে টিকিট দিয়ে অন্য জাতির ভোট ধরে রেখেছিলেন। তেজস্বী এই কৌশল অবলম্বন করলে ১০-১৫% কুর্মী-কোহরি ভোট বাড়তে পারত।
২. সহযোগী দলগুলিকে গুরুত্ব না দেওয়া
মহাজোটের মধ্যে কংগ্রেস এবং বাম দলগুলিকে সঠিক প্রাধান্য দিতে পারেননি তেজস্বী।
-
ঐক্যতা: সিট ভাগাভাগি নিয়ে একাধিকবার দ্বন্দ্ব মহাজোটকে দুর্বল করেছে। তেজস্বীর আরজেডি কেন্দ্রীক প্রচার শাসকদলের ভোট বাড়িয়ে দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এনডিএ একজোট দেখালেও, মহাজোটের মধ্যে সেই ঐক্য ছিল না।
-
প্রচার: কংগ্রেস ‘গ্যারান্টি’ ইস্তেহারে জোর দিলেও, তেজস্বী কেবল কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা নিয়ে প্রচার করেন, যা সহযোগিতার ভাব তুলে ধরেনি। এমনকি মহাজোটের ঘোষণাপত্রের নামও তিনি ‘তেজস্বী প্রণ’ রেখেছিলেন।
৩. প্রতিশ্রুতিতে ‘ব্লু প্রিন্ট’-এর অভাব
তেজস্বী যাদব অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি (প্রতি ঘরে সরকারি চাকরি, মহিলা স্বনির্ভরতা, মদ বন্ধ) দিলেও, তার কোনো সুস্পষ্ট ব্লু প্রিন্ট দেখাতে পারেননি।
-
অবিশ্বাস: প্রতিশ্রুতিগুলির জন্য অর্থ সংগ্রহ (Funding) এবং বাস্তবায়নের সময়োপযোগী পরিকল্পনার অভাব ভোটারদের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়িয়েছে।
-
বিপরীত ফল: প্রতিদিন তিনি প্রতিশ্রুতি দিতেন যে আগামী ২ দিনের মধ্যে ব্লু প্রিন্ট দেবেন, কিন্তু তা বাস্তবে দেখাতে পারেননি, যা তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা কমিয়েছে।
৪. মুসলিমদের প্রাধান্য: ভোটের মেরুকরণ
মহাগঠবন্ধনের মুসলিমপ্রীতিও পরাজয়ের নেপথ্যে একটি বড় কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।
-
বুমেরাং: মুসলিম অধ্যুষিত আসনে জয় এলেও, তা গোটা বিহারের ক্ষেত্রে নেতিবাচক মেরুকরণ তৈরি করেছে। অনেক ক্ষেত্রে মুসলিমপ্রীতির জন্য যাদব ভোটও হাতছাড়া হয়েছে তেজস্বীর।
-
প্রচার: ক্ষমতায় এলে ওয়াকফ বিল লাগু না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তেজস্বী। বিজেপি লালুপ্রসাদ যাদবের সংসদ এলাকায় এই ওয়াকফ বিল নিয়ে একাধিক প্রচার চালায়, যার ফায়দা ঘরে তুলেছে গেরুয়া শিবির।
৫. লালু প্রসাদকে নিয়ে বিভ্রান্তি
তেজস্বী যদিও লালুপ্রসাদের রাজনৈতিক পরম্পরা বজায় রাখার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পোস্টারে বাবার ছবি অনেকটাই ছোট করে দেখানো হয়েছিল।
-
বিজেপির আক্রমণ: প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং গোপালগঞ্জের র্যালিতে বলেন, “পোস্টারে লালুকে কোণে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এটা তাঁর অপমান।” এর ফলে বিহারবাসীর সামনে তেজস্বীর ‘মুখে এক আর মনে এক’ ভাবমূর্তি তৈরি হয়, যা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।