১২ বছর পর সোনাগাছি মামলায় ন্যায়বিচার! দোষী সাব্যস্ত যৌনপল্লির মালকিন

১২ বছর আগে রাজধানীর কুখ্যাত যৌনপল্লি জিবি রোড থেকে পাচার হওয়া দুই কিশোরী — ১৫ বছরের নুর এবং ১৮ বছরের রূপাকে (নাম পরিবর্তিত) — মুক্তির ঘটনায় অবশেষে ন্যায়বিচার পেলেন তাঁরা। এই মামলায় যৌনপল্লির মালকিন জয়া ওরফে পদ্মাকে দোষী সাব্যস্ত করে দিল্লির তিস হাজারি কোর্ট। বৃহস্পতিবার ঘোষিত রায়ে জয়ার ১০ বছর করে জেল ও জরিমানা হয়েছে।
এই মামলায় দুই পাচার-কন্যাকে মোট সাড়ে ১৭ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন অ্যাডিশনাল সেশন জাজ সোনম গুপ্তা। এর মধ্যে মৃত নুরের জন্য সাড়ে ১০ লক্ষ টাকা এবং রূপার জন্য ৭ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ এবং সহযোগী এনজিও ‘শক্তিবাহিনী’-র উদ্যোগে এই দুই কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
এই রায় যখন দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে রূপার কাছে পৌঁছয়, তখন সুবিচার পাওয়ার স্বস্তির চেয়ে তাঁর মনে অজানা আশঙ্কা বেশি কাজ করে। বর্তমানে দুই সন্তানের মা রূপা ভাবছেন, তাঁর এই ভয়াবহ অতীতের কথা যদি স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সকলে জেনে যান, তবে হয়তো তাঁর সংসার ভেঙে যাবে। সংসার ভেসে যাওয়ার এই ভয় তাঁকে বারবার আঁতকে তুলছে।
তবে এই স্বস্তি বা আশঙ্কা কোনওটাই নেই মৃত নুরের পরিবারে। লড়াই জিতেও নুরের জন্য অপেক্ষা করছে কেবল এক রাশ বেদনা। পাচার হয়ে যাওয়া সেই মেয়েটিকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বাবা ফিরিয়ে এনেছিলেন। ট্রমা কাটিয়ে মাধ্যমিকও পাস করেছিল সে। কিন্তু ১৭ বছর পেরোতেই বাবা তার বিয়ে দিয়ে দেন। ২০২০ সালে, অতিমারীর লকডাউনের সময়, মাত্র আধ দিনের জ্বরে চিরঘুমে চলে যায় নুর।
এখন নুরের দুই শিশু সন্তান— মেয়ে ক্লাস টু-তে আর ছেলে কেজি ওয়ানে পড়ে। দাদু-দিদাই তাদের সব। ক্ষতিপূরণের খবর শুনেও সব হারানোর ব্যথায় বৃদ্ধা মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “আমার কলিজাটাই তো নেই… যদি এই দিনটা দেখতে পেত।”
নাতনির চোখে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন
নাতনিকে বুকে আঁকড়ে ধরে দিদা সংকল্প করেন, “তোকে আমি ছোট বয়সে বিয়ে দেব না। তুই পড়বি, অনেক দূর পড়বি।” নিষ্পাপ চোখে সেই মেয়ে তখন প্রতিবেদককে আলতো গলায় বলে, “ডাক্তার হব।” কেন? “সব্বার অসুখ সারিয়ে দেব। তা হলে কেউ মরে যাবে না।”
নুরের বাবাও তাঁর না-হওয়া স্বপ্ন দেখেন নাতনির মধ্যে। নুর সরকারি চাকরি করতে চেয়েছিল, তা তো হয়নি। এখন ক্ষতিপূরণের অর্থ জমা হলে এই শিশুদের ভবিষ্যতের কিছুটা সুরাহা হতে পারে। বৃদ্ধ দম্পতি কেবল স্বগতোক্তি করেন, “আমরা আর ক’দিন বা। তার পরে কী হবে সোনামণিদের!”
১১ বছর পরে আইনি লড়াইয়ে জিতেও, একদিকে নুরের বাবা-মায়ের চোখে যেমন এক অপূরণীয় শূন্যতা, অন্যদিকে বিজয়িনী রূপার দীর্ঘশ্বাস— দুই জীবনের অদ্ভুত সমাপতন যেন কঠিন বাস্তবকে সামনে এনে দাঁড় করাল।