মৃত্যুর পর টনক নড়ল ৫০০ গুণ বেশি বিষাক্ত রাসায়নিক মিলেছে সিরাপে, কারখানায় WHO মান না থাকায় স্রেসানকে অনুসরণ করবে কেন্দ্র!

ঘরোয়া বাজারে তৈরি কফ সিরাপ খেয়ে সম্প্রতি কমপক্ষে ২৪টি শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে ক্ষোভের জেরে কঠোর অবস্থানে গেল ভারত সরকার। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী তাদের উৎপাদন সুবিধা (manufacturing facilities) উন্নীত করার জন্য ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির সময়সীমা বাড়ানোর অনুরোধ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে কেন্দ্র। এই সিদ্ধান্তের ফলে ছোট এবং মাঝারি মাপের প্রায় ৪,০০০ সংস্থার ভবিষ্যৎ এখন প্রশ্নের মুখে।
সরকারি সূত্রের খবর, এই সময়সীমা বাড়ানোর আর্জি খারিজ করার মূল কারণ হলো, সর্বশেষ শিশুমৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত ‘কোল্ডরিফ’ (Coldrif) সিরাপ প্রস্তুতকারী সংস্থা স্রেসান ফার্মাসিউটিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার তাদের উৎপাদন ইউনিটে প্রয়োজনীয় আধুনিকীকরণ করেনি। সরকারের সিদ্ধান্তটি বৃহস্পতিবার একটি কনফারেন্সে ওষুধ প্রস্তুতকারকদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কেন কঠোর হলো কেন্দ্র?
২০২৩ সালের শেষের দিকে ভারত সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দ্বারা প্রস্তাবিত মানদণ্ড (GMP – Good Manufacturing Practice) পূরণের জন্য ফার্মা কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দিয়েছিল। আফ্রিকায় ১৪০ জনেরও বেশি শিশুর মৃত্যুর পর “বিশ্বের ফার্মেসি” হিসাবে ভারতের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হওয়ার পরই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
বড় সংস্থাগুলি ২০২৪ সালের জুন মাসের সময়সীমা মেনে চললেও, ছোট সংস্থাগুলিকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা আরও সময় চেয়েছিল, যার উত্তরে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের এক কর্মকর্তা বলেন, “বারবার সময়সীমা বাড়ানো যেতে পারে না— মানুষ মারা যাচ্ছে।”
স্রেসানের সিরাপে ৫০০ গুণ বিষ!
সরকারি পরীক্ষায় দেখা গেছে, স্রেসান প্রস্তুতকারক ‘কোল্ডরিফ’ সিরাপে ডিইজি (Diethylene Glycol) বা ডাইইথিলিন গ্লাইকলের পরিমাণ ছিল ৪৮.৬%, যা ভারত এবং WHO দ্বারা নির্ধারিত সীমার প্রায় ৫০০ গুণ বেশি!
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ডিইজি একটি অত্যন্ত বিষাক্ত রাসায়নিক যা কখনও কখনও দামি ফার্মাসিউটিক্যাল-গ্রেড দ্রাবক, যেমন গ্লিসারিন বা প্রোপিলিন গ্লাইকোল, এর পরিবর্তে সস্তা বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
এই ভয়ঙ্কর বিষাক্ততার খবর জানার পরই সরকার সময়সীমা বাড়ানোর সমস্ত আবেদন উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ইতোমধ্যে স্রেসানের উৎপাদন লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে এবং এর প্রতিষ্ঠাতা এস. রঙ্গনাথনকে হত্যা মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, কারখানায় বিদ্যমান মানদণ্ডেরও গুরুতর লঙ্ঘন করা হয়েছিল।
রেকর্ড এবং মৃত্যুর শেষ কথা:
স্রেসানের এই গাফিলতির ফল ভুগতে হয়েছে মধ্যপ্রদেশের সাড়ে তিন বছরের শিশু মায়াঙ্ক সূর্যবংশীকে। সাধারণ জ্বরের জন্য এই সিরাপ খেয়ে গত ৯ অক্টোবর কিডনি অকেজো হয়ে তার মৃত্যু হয়। মায়াঙ্কের বাবা নিলেইশ সূর্যবংশী বলেন, “আমরা কখনও ভাবিনি একটি সাধারণ ওষুধ প্রাণঘাতী হতে পারে। আমার সন্তান যেন শেষ শিকার হয়। সরকার নিশ্চিত করুক, আর কোনও বাবা-মাকে যেন এমন ভোগান্তি পোহাতে না হয়।”
ক্ষতিগ্রস্ত ছোট কোম্পানিগুলির দুশ্চিন্তা:
ভারতের $৫,০০০ কোটি ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্পে প্রায় ৩,০০০ কোম্পানি ১০,০০০-এর বেশি কারখানা পরিচালনা করে। এর মধ্যে প্রায় ৪০% ওষুধ ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ (SME) দ্বারা উৎপাদিত হয়।
এসএমই ফার্মা ইন্ডাস্ট্রিজ কনফেডারেশনের সেক্রেটারি জগদীপ সিং হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, যদি সময়সীমা না বাড়ানো হয়, তবে হিমাচল প্রদেশের ফার্মাসিউটিক্যাল হাবের প্রায় অর্ধেক উৎপাদন ইউনিট বন্ধ হয়ে যাবে, যার ফলে চরম ঘাটতি এবং বেকারত্ব সৃষ্টি হতে পারে।
তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি এখন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, উৎপাদনকারী সংস্থাগুলির উচিত দ্রুত WHO মানদণ্ড মেনে চলায় বিনিয়োগ করা এবং সরকারের কাজ শুধু তাদের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা।