‘১০ হাজার টাকায় গরু কেনা যায়, ক্ষমতা নয়’🐄! নীতীশ কুমারের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফুঁসছে ‘নীরব ভোটব্যাঙ্ক’, কী হবে বিহারে?

বিহারের রাজনীতিতে মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের সবচেয়ে বড় ভরসা হলেন রাজ্যের নারীরা, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে তাঁর ‘নীরব ভোটব্যাঙ্ক’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু আসন্ন নির্বাচনের আগে, এই গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাঙ্কের আনুগত্যে ফাটল ধরার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বাকতিয়ারপুর-এর একটি ছোট গ্রামের উঠোনে বসে মহিলারা নিজস্ব ভঙ্গিতে এক গান বা ‘চৌপা’ গাইছেন: “হামার ঘর, হামার ইজ্জত, হামার ফয়সলা…” (আমার ঘর, আমার সম্মান, আমার সিদ্ধান্ত)। এই গান যেমন সরল, তেমনি গভীর। এই গানই যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে, তাদের রাজনৈতিক আনুগত্য এখন আর সরলভাবে নীতীশের দিকে নেই।
উপকারভোগী না মূল্যায়নকারী?
মুখ্যমন্ত্রী মহিলা রোজগার যোজনার (Mukhyamantri Mahila Rojgar Yojana) অধীনে সম্প্রতি ১.২৫ কোটি মহিলার অ্যাকাউন্টে প্রথম কিস্তি হিসেবে ₹১০,০০০ টাকা সরাসরি স্থানান্তরিত করেছেন নীতীশ কুমার। এই প্রকল্পের উপকারভোগী হওয়া সত্ত্বেও, গ্রামের মহিলারা এখন অনুদান এবং প্রকৃত ক্ষমতায়নের মধ্যে পার্থক্য করতে শিখছেন।
৩২ বছর বয়সী রেখা দেবী বলেন, “আমি একটা ছাগল কিনেছি, অন্তত দুধ দেয় এবং পরে বাচ্চা বিক্রি করার সুযোগ আছে। কিন্তু ১০ হাজার টাকা খুব বেশি দূর যায় না, জিনিসপত্রের যা দাম!”
২৮ বছর বয়সী অনিতা সিং, যিনি সেলাইয়ের ব্যবসায় টাকাটি বিনিয়োগ করেছেন, তিনি আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “আমরা কৃতজ্ঞ, তবে এটাই ক্ষমতায়ন নয়। নিয়মিত উপার্জন হলে, অন্ধকার নামলে রাস্তা দিয়ে নিরাপদে হেঁটে বাড়ি ফিরতে পারলে তবেই তা সত্যিকারের ক্ষমতায়ন। আর, খোলা ড্রেন পেরোনোর সময় নিজেদের এবং বাচ্চাদের জীবন নিয়ে আমাদের ভয় না থাকলে, তবেই উন্নতি হয়েছে বলা যায়।”
৪০ বছর বয়সী সোনি পাসওয়ান, যিনি একটি গরু কিনেছেন, তিনি পরবর্তী কিস্তির জন্য অপেক্ষা করছেন একটি ছোট দুগ্ধ ইউনিট শুরু করার আশায়। এই মিশ্র অনুভূতিই বিহারের নারী ভোটারদের মনোভাব—কৃতজ্ঞতা আছে, কিন্তু তার সঙ্গে রয়েছে আরও কিছু পাওয়ার আকুলতা। তাঁদের মতে, এককালীন অনুদান একটি স্বল্পমেয়াদী স্বস্তি মাত্র, স্থায়ী সমাধান নয়।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর ‘ডাবল দিওয়ালি’ এবং ‘নারীশক্তি’
মহিলা ভোটারদের এই গণিত যে নীতীশ কুমারের NDA জোটের জন্য অত্যন্ত জরুরি, তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মন্তব্যেও স্পষ্ট। বুধবার বুথ কর্মীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে মোদী বলেন, “বিহারের ১ কোটি ২০ লাখ বোনের অ্যাকাউন্টে ১০,০০০ টাকা করে পৌঁছেছে। এটা জেনে আমি খুব খুশি।”
বিহারে এনডিএ-র বিজয় প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আশাবাদী হয়ে বলেন, “এবার বিহারে ডাবল দিওয়ালি আসছে। একটি ২০ অক্টোবর, আর অন্যটি ১৪ নভেম্বর এনডিএ-র জয়ের জন্য উদযাপিত হবে। আর এতে বরাবরের মতো বিহারের বোনেরা এবং কন্যারা বড় ভূমিকা পালন করবেন।”
আনুগত্যের ব্যাকরণ পরিবর্তন
‘জীবিকা যোজনা’ থেকে শুরু করে সাইকেল বিতরণ—নীতীশ কুমার দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি জীবনে প্রভাব ফেলা জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছেন। কিন্তু মাঠের পরিস্থিতি এখন সরল নেই।
৪৮ বছর বয়সী শান্তি দেবী বলেন, “আমরা বলছি না নীতীশজি কিছুই করেননি। কিন্তু আমরা শুধু টাকার চেয়ে আরও বেশি কিছু আশা করেছিলাম।”
বর্তমানে, বিহারের গ্রামীণ মহিলারা কেবল সুবিধাভোগী নন, তাঁরা কঠোর পর্যবেক্ষক ও মূল্যায়নকারী। তাঁদের উন্নয়নের মানদণ্ড এখন DBT (সরাসরি অর্থ স্থানান্তর) পেরিয়ে ‘মর্যাদা’ (Dignity) এবং নিরাপত্তার দিকে প্রসারিত হয়েছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলই জানে যে গ্রামীণ মহিলারা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ‘সুইং ব্লক’। কিন্তু ২০২০ সালের মতো, এবার এই ব্লকের রাজনৈতিক আনুগত্য বিভক্ত বলে মনে হচ্ছে।
নীতীশ কুমারের প্রচারের কেন্দ্রে নারীকল্যাণ থাকলেও, যে নারীরা একসময় তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভোটব্যাঙ্ক ছিলেন, তাঁরা এখন আনুগত্যের ব্যাকরণ বদলে দিয়েছেন। জনসভায় হয়তো তাঁরা নীতীশের প্রশংসা করবেন, কিন্তু তাদের ব্যক্তিগত রায় এবার সূক্ষ্ম এবং জটিল। তাদের মধ্যে তৈরি হওয়া ‘এজেন্সি’ বা স্ব-কর্তৃত্বের অনুভূতিই হয়তো বিহারের আসন্ন নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে।