‘কন্যাসন্তানদের শুধু টিকে থাকলে চলবে না, বিকশিত হতে হবে’, লিঙ্গানুপাত কমায় উদ্বেগ প্রকাশ সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতির

দেশের কয়েকটি রাজ্যে কন্যা ভ্রূণহত্যা এবং শিশুকন্যা হত্যার কারণে লিঙ্গানুপাত (Sex Ratio) ক্রমশ অবনতির দিকে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বিভি নাগারত্না। তিনি সাফ জানিয়েছেন, কন্যাসন্তানদের শুধু বেঁচে থাকা নয়, তাদের যথাযথ বিকাশও নিশ্চিত করতে হবে।

গত শনিবার (১১ অক্টোবর, ২০২৫) সুপ্রিম কোর্টের জুভেনাইল জাস্টিস কমিটি এবং ইউনিসেফ ইন্ডিয়ার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক জাতীয় আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এই কড়া বার্তা দেন।

‘ছেলে শিশুর মতো অধিকার চাই’
বিচারপতি নাগারত্না জোর দিয়ে বলেন, ভারতের একটি শিশুকন্যাকে তখনই প্রকৃত অর্থে সমান নাগরিক হিসেবে গণ্য করা যাবে, যখন সে তার পুরুষ প্রতিপক্ষের মতো যেকোনো কিছু অর্জনের স্বপ্ন দেখতে পারবে এবং লিঙ্গবৈষম্যের বাধা ছাড়াই সমান সুযোগ পাবে।

তাঁর কথায়, “এ দেশে জন্মানো একটি ছেলে শিশুর মতো তারও জন্মের অধিকার, সঠিক পুষ্টি, যত্ন, শিক্ষা, নিরাপদ পরিবেশ এবং নিজের পরিচিতি গড়ে তোলার সুযোগ থাকতে হবে। তাকে শুধু টিকে থাকলে চলবে না, সক্রিয়ভাবে বিকশিত হতে হবে।”

তিনি উল্লেখ করেন, ভারতে একটি শিশুকন্যার প্রথম বাধাই হলো তার জন্ম নেওয়ার অধিকার। ছেলে না হয়ে মেয়ে হয়েছে শুনলে আজও অনেক পরিবার হতাশ হয়, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

পুষ্টি ও শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য
বিচারপতি নাগারত্না পুষ্টির যত্নের উপর জোর দিয়ে বলেন, সঠিক পুষ্টি ছাড়া কন্যাসন্তানের উন্নতির সমস্ত প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হতে পারে।

পুষ্টির বৈষম্য: তিনি জানান, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ছেলেদের তুলনায় কন্যাসন্তানদের ইচ্ছাকৃতভাবে কম বা নিম্নমানের খাবার দেওয়া হয়। এই অপুষ্টি তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

শিক্ষার বাধা: বিচারপতি নাগারত্না মাধ্যমিক স্তরের পর মেয়েদের স্কুলছুটের উচ্চ হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “ছেলের স্বপ্নপূরণের জন্য অনেক সময় মেয়েটিকে নিজের পড়াশোনা পুরোপুরি বিসর্জন দিতে হয় বা এমন বিষয় নিয়ে পড়তে হয়, যাতে তার আগ্রহ নেই।”

বাল্যবিবাহ কমেছে, তবুও উদ্বেগ
তিনি বাল্যবিবাহ প্রসঙ্গে জানান, সরকারি নীতি এবং সামাজিক প্রচারের ফলে গত পনেরো বছরে দেশে বাল্যবিবাহের হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা একটি ইতিবাচক দিক। তবে তিনি বাল্যবিবাহ রোধ আইন, ২০০৬-এর সঠিক বাস্তবায়নের উপর জোর দেন এবং আঞ্চলিক বাস্তবতা মাথায় রেখে সামগ্রিক সমাধানসূত্র তৈরি করার আহ্বান জানান।

নারীই পথ দেখাবে বিশ্বশক্তি ভারতকে
গুণগত শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে বিচারপতি নাগারত্না বলেন, শুধুমাত্র মেয়েদের ক্ষমতায়নের জন্যই নয়, দেশের সমৃদ্ধির জন্যও শিক্ষা অপরিহার্য।

তিনি বলেন, “ভারত যদি বিশ্বশক্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখে, তবে আজকের শিশুকন্যাদের ভবিষ্যতের নারী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যারা দেশের যাত্রাপথ নির্ধারণ করবে।”

এছাড়াও, তিনি আদালত ও থানাগুলিতে ট্রমা-অবগত এবং শিশুবান্ধব পদ্ধতি প্রসারের উপর জোর দেন। মানব পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগে সাজাপ্রাপ্তের হার (মাত্র ৪.৮%) নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় ভারতের প্রধান বিচারপতি বিআর গাভাই, কেন্দ্রীয় নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবী সহ শীর্ষ আদালতের অন্য বিচারপতিরাও উপস্থিত ছিলেন।