বিশেষ: ইস্টার দ্বীপের মূর্তিগুলো কি সত্যিই ‘হাঁটত’? যে প্রমাণ মিলল পদার্থবিদ্যায়?

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইস্টার দ্বীপের (Easter Island) বিশাল পাথরের মূর্তি, যা মোয়াই (Moai) নামে পরিচিত, মানবজাতির মনে এক অনির্বচনীয় বিস্ময় ও রহস্য জাগিয়ে রেখেছে। ‘রাপা নুই’ (Rapa Nui) দ্বীপের প্রাচীন মানুষেরা চাকা বা আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই কীভাবে প্রায় ৮০ টন ওজনের এই বিশাল পাথরের মূর্তিগুলি রুক্ষ ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সরাতে পেরেছিলেন?

অবশেষে এই জটিল রহস্যের উত্তর খুঁজে পাওয়ার দাবি করেছেন বিংহ্যামটন ইউনিভার্সিটি ও ইউনিভার্সিটি অফ অ্যারিজোনার গবেষকদের একটি দল।

‘হাঁটানো’র তত্ত্ব পেল পরীক্ষামূলক প্রমাণ

মোয়াই মূর্তিগুলোকে ‘হাঁটিয়ে’ (Walking) স্থানান্তর করা হতে পারে—এই ধারণা বহু বছর ধরেই প্রচলিত ছিল। কিন্তু এবারই প্রথম এর পক্ষে পরীক্ষামূলক ও পদার্থবিজ্ঞানের প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছে।

পদার্থবিজ্ঞান, থ্রিডি কম্পিউটার মডেলিং এবং বাস্তব পরীক্ষার মাধ্যমে গবেষক দল নিশ্চিত করেছেন যে, রাপা নুইয়ের মানুষেরা দড়ি ব্যবহার করে মূর্তিগুলোকে সোজা অবস্থায় ‘হাঁটানোর’ মতো করে সরাতেন। বিশেষ ধরনের রাস্তা তৈরি করে এগুলিকে দুলতে দুলতে জিগজ্যাগ পথে এগিয়ে নেওয়া হতো। এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক ‘জার্নাল অফ আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্স’-এ।

গবেষক কার্ল লিপো বলেছেন, “একবার মূর্তিটিকে নড়াতে পারলেই কাজটা মোটেও কঠিন নয়, এক্ষেত্রে মানুষ এক হাত দিয়েই টানছিল। এতে শক্তি সাশ্রয় হয় ও মূর্তিটিও বেশ দ্রুত এগোয়।”

নকশার সূক্ষ্মতা থেকেই মিলেছে ইঙ্গিত

গবেষকরা প্রায় ১ হাজারটির মতো মোয়াই মূর্তি পরীক্ষা করে তাদের নকশার সূক্ষ্ম দিকগুলি বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁরা লক্ষ্য করেন:

  • বিশেষ ভিত্তি: অনেক মূর্তিরই চওড়া, ডি-আকৃতির ভিত্তি এবং সামান্য সামনের দিকে ঝোঁক রয়েছে।
  • সহজ স্থানান্তর: এই নকশাগত বৈশিষ্ট্যই মূর্তিগুলিকে সোজা অবস্থায় সরানোর বিষয়টি সহজ করে তুলেছে।

এই ধারণা প্রমাণ করতে গবেষকরা একই বৈশিষ্ট্যওয়ালা ৪.৩৫ টন ওজনের এক মোয়াই মূর্তির প্রতিরূপ তৈরি করেন। কেবল ১৮ জন মানুষ ও কয়েকটি দড়ি ব্যবহার করেই তাঁরা সফলভাবে মূর্তিটিকে ৪০ মিনিটে ১০০ মিটার দূরত্বে সরিয়ে নিতে পেরেছেন। এটি আগের যে কোনো পদ্ধতির তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর ও দ্রুত।

লিপো বলেছেন, “পদার্থবিজ্ঞানের দিক থেকে ব্যাপারটা পুরোপুরি যুক্তিসঙ্গত। এসব মূর্তি যত বড়, তাদের নড়াচড়াও তত বেশি স্থির ও নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে এত বিশাল বস্তু স্থানান্তরের এটিই সম্ভবত একমাত্র বাস্তবসম্মত উপায়।”

রহস্য লুকিয়ে প্রাচীন রাস্তাতেই

রাপা নুই দ্বীপের রাস্তা থেকেও এই ‘হাঁটানো’ ধারণার আরও প্রমাণ মেলে। প্রাচীন এই পথগুলি প্রায় ৪.৫ মিটার চওড়া এবং আকারে কিছুটা অবতল (Concave) বা ভেতরের দিকে দেবে থাকা। এই নকশা দুলতে থাকা মূর্তিগুলিকে সামনের দিকে এগোনোর সময় ভারসাম্য রাখতে ও সঠিক পথে পরিচালিত হতে সাহায্য করেছে।

লিপো অনুমান করেছেন, রাপা নুইয়ের মানুষেরা এসব মূর্তি স্থানান্তরের অংশ হিসেবেই এই ধরনের রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন। তিনি বলেন, “প্রতিবার যখনই একটি মূর্তি সরাতেন তখনই একটি রাস্তা বানাতেন তারা।”

এই গবেষণা কেবল একটি ঐতিহাসিক রহস্যের সমাধানই নয়, বরং রাপা নুই জনপদের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাকেও তুলে ধরেছে, যা সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সম্ভব হয়েছিল।