‘রিপোর্টে বিশ্বাস নেই, ‘ধর্ষণের আলামত না মেলার খবর ফাঁস হতেই বিতর্ক, আর খুনের ময়না তদন্তেও চরম দেরি!

এক আদিবাসী কিশোরী ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘাত, সহিংসতা ও তিন আদিবাসীর মৃত্যুর ঘটনায় চরম বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে যেমন পুলিশি কাজে বাধা ও ভাঙচুরের অভিযোগে মোট ১১০০ জনকে আসামি করে তিনটি মামলা হয়েছে, অন্যদিকে নিহত তিনজনের পরিবার মামলা করতে রাজি না হওয়ায় পুরো ঘটনাটিই এক রহস্যের জালে জড়িয়ে পড়ছে।

প্রশ্ন উঠছে—যারা তিন আদিবাসীকে হত্যা করলো, তারা কি পার পেয়ে যাবে? এই জটিল পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের ক্ষোভ আরও বেড়েছে ধর্ষণের মেডিকেল প্রতিবেদন দ্রুত সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাওয়ায়।

ফাঁস হলো মেডিকেল রিপোর্ট: “ধর্ষণের আলামত নেই”
আদিবাসী কিশোরী ধর্ষণের ঘটনার সাত দিন পর যে মেডিকেল প্রতিবেদন দেওয়া হয়, তা দ্রুত সংবাদমাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেছে। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।

গোপনীয়তা লঙ্ঘন: মেডিকেল বোর্ডের প্রধান ডা. জয়া চাকমা সহ কিশোরীর বাবা—উভয়েই প্রশ্ন তুলেছেন, একটি গোপন রিপোর্ট কীভাবে সাংবাদিকদের হাতে গেল?

সিভিল সার্জন ও পুলিশ সুপার: জেলা পুলিশ সুপার মো. আরেফিন জুয়েল জানিয়েছেন, তিনি সিভিল সার্জনের কাছ থেকে প্রতিবেদন পেয়ে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়েছেন। তবে জেলা সিভিল সার্জনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

মানবাধিকার কর্মীর উদ্বেগ: মানবাধিকার কর্মী নূর খান এই দ্রুত প্রতিবেদন ফাঁসের ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, ধর্ষণের পর কী পরিস্থিতিতে পরীক্ষা হয়েছে, কিশোরী গোসল করেছিল কিনা বা কাপড় পরিবর্তন হয়েছে কিনা—এমন অনেক বিষয় রিপোর্টের সত্যতা নির্ধারণ করে, এবং “আসলে এখন আর কোনো রিপোর্টের ওপরই আমাদের বিশ্বাস নেই।”

নিহতদের পরিবারে নীরবতা: “বিচার পাবো?”
২৮ অক্টোবর গুইমারায় অবরোধ চলাকালে হামলা ও সংঘর্ষে আথুই মারমা (২১), আথ্রাউ মারমা (২২) ও তৈইচিং মারমা (২০) নামে তিন আদিবাসী নিহত হন। এই মর্মান্তিক ঘটনার পরও নিহতদের পরিবারের কেউ মামলা করতে রাজি হননি।

পরিবারের হতাশা: গুইমারার নিহত আথুই মারমার বাবা হ্লাচাই মারমা প্রশ্ন তুলেছেন, “মামলা করে কী হবে? আপনি বিচার করতে পারবেন? আমরা বিচার পাবো?” এরপর তিনি আর কোনো কথা বলতে চাননি।

পুলিশের ভাষ্য: পুলিশ সুপার জানান, পরিবার মামলা করতে রাজি হচ্ছে না, কারণ তারা “গরিব-দুঃখী মানুষ”। তবে তিনি আশ্বাস দেন, “শেষ পর্যন্ত পরিবার মামলা না করলে পুলিশকে তো মামলা করতেই হবে।”

ময়না তদন্তে দেরি: যেখানে ধর্ষণের মেডিকেল রিপোর্ট দ্রুত ফাঁস হলো, সেখানে তিন নিহতের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট পেতে দেরি হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। নূর খানের মতে, “যে রিপোর্ট দ্রুত পেলে সুবিধা, তারা সেটা দ্রুত পাবার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু হত্যার ময়না তদন্ত প্রতিবেদনে দেরি হচ্ছে। কারণ, ওই প্রতিবেদনে স্পষ্ট হবে যে, তিন আদিবাসী কীভাবে নিহত হয়েছেন, গুলিতে নিহত হলে কাদের গুলিতে নিহত হয়েছে।”

পুলিশের মামলা: ১১০০ জন আসামি, কিন্তু হত্যা কেন নয়?
পুলিশের পক্ষ থেকে তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যার বেশিরভাগই সংঘাত এবং সম্পত্তি ধ্বংস সংক্রান্ত।

প্রথম মামলা: সরকারি কাজে বাধা, সরকারি কর্মচারীদের আহত করা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগে অজ্ঞাত ৩০০ জন আসামি।

দ্বিতীয় মামলা: হত্যার অভিযোগে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।

তৃতীয় মামলা: ১৪৪ ধারা ভেঙে সরকারি কাজে বাধা ও সহিংসতার অভিযোগে অজ্ঞাত ৮০০ জন আসামি।

পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ
খাগড়াছড়ি মহিলা কল্যাণ সমিতি এবং স্থানীয় ছাত্র সংগঠনের নেতারা বলছেন, পার্বত্য জেলাগুলিতে দীর্ঘদিন ধরেই আদিবাসীদের প্রতি জাতিগত অবদমন চলছে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি: খাগড়াছড়ির মহিলা কল্যাণ সমিতির মনীষা তালুকদার বলেন, ধর্ষণের বিচার পাওয়া যায় না। আসামি ধরা পড়লেও জামিনে ছাড়া পেয়ে যায়। “ডিএনএ’র মিল না পাওয়া, মেডিকেল প্রতিবেদনে আলামত না পাওয়া এখানে একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে,” যা নিয়ে তাঁদের সন্দেহ আছে।

প্রভাবশালীদের চাপ: বাংলাদেশ মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিলের ওয়াইবাই মারমা জানান, পুলিশ প্রশাসনের কাছে গেলেও তারা এই ধরনের ঘটনাকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মামলা করতে নিরুৎসাহিত করে। প্রভাবশালীরা টাকার বিনিময়ে মীমাংসার চেষ্টা করে।

রাজনীতির মোড়: সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ইউপিডিএফ-এর মতো আঞ্চলিক সংগঠনগুলিকে সহিংসতার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী জাকির হোসেন মনে করেন, পাহাড়িদের জমিদখল, উচ্ছেদ, শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়া—এই সব পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশই এই সাম্প্রতিক সহিংসতা।

খাগড়াছড়ি সদর ও গুইমারায় এখনও ১৪৪ ধারা বহাল আছে এবং জনজীবন স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে নিহত তিনজনের বিচারের দাবি ও ধর্ষণের রিপোর্টের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত।

Tools