ঐতিহাসিক’ ট্রাম্পের ২০-দফা শান্তি প্রস্তাবে লুকোনো ফাঁদ? গাজার ভবিষ্যৎ ঘিরে ৫টি অস্পষ্ট প্রশ্ন, যা ইসরায়েলকে দিচ্ছে ‘অনির্দিষ্ট দখল’-এর সুযোগ!

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সাথে মিলে গাজা যুদ্ধবিরতির জন্য একটি ২০-দফা প্রস্তাব পেশ করেন, যা তিনি ‘ঐতিহাসিক’ বলে দাবি করেছেন। এই পরিকল্পনায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি, হামাসের হাতে থাকা সকল পণবন্দীর মুক্তি এবং ইসরায়েলের কারাগার থেকে প্রায় ২,০০০ ফিলিস্তিনি কয়েদির মুক্তির শর্ত রাখা হয়েছে। তবে আল জাজিরার রিপোর্ট এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রস্তাবে এমন কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে যা ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎকে আরও গভীর অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষত গাজার শাসন, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনা নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

পরিকল্পনার প্রধান দুর্বলতা ও অমীমাংসিত প্রশ্ন:

১. গাজার শাসনভার কার হাতে?
প্রস্তাবে একটি “অস্থায়ী সংস্থা শাসন” (Temporary Entity Governance)-এর কথা বলা হয়েছে, যা একটি “কারিগরি, অরাজনৈতিক ফিলিস্তিনি কমিটি” দ্বারা পরিচালিত হবে। কিন্তু এই কমিটির গঠন প্রক্রিয়া, সদস্য নির্বাচন এবং দৈনন্দিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে কোনো স্পষ্টতা নেই। ট্রাম্প ও টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বে গঠিত “শান্তি বোর্ড” এই কমিটির তদারকি করবে, কিন্তু এই দুই সংস্থার মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন কেমন হবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।

২. ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (PA) ভূমিকা কী?
পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, পিএ তাদের ‘সংস্কার কর্মসূচি’ সম্পন্ন করার পরই কেবল গাজার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। তবে এই ‘সংস্কারের’ মানদণ্ড কী হবে, কারা এর অনুমোদন দেবে এবং এর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা কী, তা উল্লেখ করা হয়নি। উপরন্তু, নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য — “গাজার প্রশাসন হামাস বা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দ্বারা হবে না” — পুরো পরিকল্পনাকে আরও অস্পষ্ট করে তুলেছে।

৩. আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যৎ কী?
গাজার নিরাপত্তার জন্য একটি “অস্থায়ী আন্তর্জাতিক সামরিক বাহিনী” গঠনের প্রস্তাব থাকলেও, এই বাহিনীতে কোন দেশগুলো যোগ দেবে, এর ম্যান্ডেট (সেনা, পুলিশ নাকি পর্যবেক্ষক) কী হবে, এবং হামাস বা ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘর্ষের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা কী হবে, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই।

৪. ইসরায়েলি প্রত্যাহারের সময়সীমা কী?
ট্রাম্পের পরিকল্পনায় ইসরায়েল গাজা থেকে পিছু হটবে বলা হলেও, কোনো স্পষ্ট সময়সূচি দেওয়া হয়নি। বরং ইসরায়েল “সন্ত্রাসী হুমকি থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ” না হওয়া পর্যন্ত গাজায় একটি “নিরাপত্তা বেষ্টনী” বজায় রাখবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অস্পষ্ট শর্ত ইসরায়েলকে গাজায় অনির্দিষ্টকালের জন্য সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার সুযোগ দিতে পারে।

৫. ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনা কতটা নিশ্চিত?
প্রস্তাবে ফিলিস্তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে কেবল ‘আকাঙ্ক্ষা’ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং “credible path to statehood” বা রাষ্ট্রের দিকে বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি ‘হতে পারে’ (may be conditions) বলা হয়েছে। এটি কোনো দৃঢ় প্রতিশ্রুতি নয়, বরং শর্তসাপেক্ষ ভবিষ্যৎ। ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের অধিকারকে নিশ্চিত না করে এটিকে কেবলই একটি সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করায় অস্পষ্টতা বেড়েছে বহুগুণ।

পরিকল্পনার মূল বিষয়বস্তু হল— গাজায় অস্থায়ী সরকার, ইসরায়েলের দখল না থাকা, হামাসের নিরস্ত্র হওয়া, পণবন্দী ও কয়েদি বিনিময় এবং যুদ্ধবিরতি। তবে এসব অস্পষ্টতা থাকা সত্ত্বেও হমাস এখনো এই শান্তি প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি, অন্যদিকে ইসরায়েল তা গ্রহণ করেছে। আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে স্পষ্টতা ছাড়া এই পরিকল্পনা কেবলই ‘কাগজের বাঘে’ পরিণত হতে পারে এবং ফিলিস্তিনের ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।