৪০ কোটির ব্রাউন সুগার উদ্ধার! মাদকের ‘প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ মালদার কালিয়াচক, ঘুম উড়ল পুলিশের

দিনের পর দিন মালদার কালিয়াচক যে মাদকের মূল কেন্দ্রে (হাব) পরিণত হচ্ছে, সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো। সম্প্রতি পুলিশ সুপারের বক্তব্যে সেই ছবি আরও স্পষ্ট। বুধবার রাতে একলপ্তে ৩৯ কিলোগ্রাম ব্রাউন সুগার বাজেয়াপ্ত করল পুলিশ, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪০ কোটি টাকা! একই সঙ্গে ধরা পড়ল মাদক তৈরির এক চাঞ্চল্যকর প্রশিক্ষণ চক্রের। এই ঘটনায় তিন মাদক প্রস্তুতকারী ও কারবারিকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ধৃতদের বৃহস্পতিবার মালদা জেলা আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁদের সাতদিনের পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন।

জেলা পুলিশকে সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে মাদক তৈরির এই চক্র। শুধু তৈরি করাই নয়, কালিয়াচকে রীতিমতো প্রশিক্ষণ দিয়ে মাদক তৈরির পদ্ধতি শেখানো হচ্ছে। পুলিশের সূত্র জানাচ্ছে, এই কারবারিরা বিহার থেকে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আসে। তারা নিয়মিত মাদক তৈরির ‘ক্লাস’ নেয় এবং তৈরি হওয়া মাদকের গুণমান পরীক্ষা করার জন্য ‘বিহারি টেস্টার’-ও রয়েছে। শুধু ব্রাউন সুগার নয়, হেরোইন তৈরিতেও এই চক্র সিদ্ধহস্ত।

বুধবার গভীর রাতে নির্দিষ্ট সূত্রের খবরের ভিত্তিতে কালিয়াচক ১ নম্বর ব্লকের মোজমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের পাকাকোট এলাকায় হানা দেয় গোলাপগঞ্জ ফাঁড়ির পুলিশ। অভিযোগ, পাকাকোট গ্রামের একটি আমবাগানে প্রায় ১০ থেকে ১৫ জনের একটি দল মাদক তৈরি করছিল। পুলিশ গিয়ে দেখে, আমগাছের সঙ্গে বাঁশ বেঁধে সাদা কাপড়ের মাধ্যমে তৈরি হওয়া ব্রাউন সুগার থেকে জল বের করা হচ্ছে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়েই দুষ্কৃতীরা পালানোর চেষ্টা করলেও ধাওয়া করে রউফ শেখ (৪৫), হাসিবুর শেখ (৪২) ও বরকত শেখ (৪৫) নামে তিনজনকে ধরে ফেলে পুলিশ। তারা প্রত্যেকেই নারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বর্তমানে কালিয়াচক এলাকায় দুটি প্রধান মাদক কারবারি চক্র সক্রিয়— মোজমপুর গ্যাং ও নারায়ণপুর গ্যাং। এই দুটি চক্রই এলাকার যুবকদের মাদক তৈরির প্রশিক্ষণ দেয়।

একসময় মালদা জেলায় আফিম চাষের কাঁচামাল পাওয়া গেলেও, প্রশাসনের কঠোর নজরদারির ফলে এখন জেলা ‘জিরো পপি কাল্টিভেশন’ হিসেবে পরিচিত। ফলে এখন এই কারবারিরা ঝাড়খণ্ড, মণিপুর-সহ উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলি থেকে কাঁচামাল আমদানি করছে। এভাবেই কালিয়াচককে তারা মাদকের এক বড় ঘাঁটিতে পরিণত করেছে।

মালদা জেলার পুলিশ সুপার প্রদীপকুমার যাদব এ প্রসঙ্গে বলেন, “বেশ কিছুদিন ধরেই খবর আসছিল। তবে এবার আমরা সফল হয়েছি। পাকাকোট গ্রামের একটি আমবাগানে অভিযান চালিয়ে ৩৯ কিলোগ্রাম ব্রাউন সুগার বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৪০ কোটি টাকা। তিনজন দুষ্কৃতীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।”

মাদক উদ্ধারের ক্রমবর্ধমান পরিসংখ্যান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পুলিশ সুপার জানান, ২০২২ সালে জেলায় মাদক সংক্রান্ত মামলা হয়েছিল ১৭১টি, উদ্ধার হয়েছিল ২৭ কিলো মাদক। ২০২৩ সালে ৪৬ কিলো এবং ২০২৪ সালের এখনও পর্যন্ত ৯৭ কিলোগ্রাম মাদক বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, জেলা থেকে মাদক কারবার সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে পুলিশ মরিয়া এবং সবরকম ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।